নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টারঃ
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সামরিক কুচকাওয়াজ কেবল একটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির একটি যুগান্তকারী বার্তা হতে যাচ্ছে। এখানে একসঙ্গে উপস্থিত থাকবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই দৃশ্য নিছক সামরিক শোভাযাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন, নতুন কৌশলগত অক্ষের উত্থান এবং পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের সীমাবদ্ধতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করছে। পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো নেতাকে আমন্ত্রণ না জানানো কেবল কূটনৈতিক সূক্ষ্মতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি এক ধরনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক ঘোষণা, যার মূল বার্তা হলো—বিশ্ব এখন বহুমেরু বাস্তবতায় প্রবেশ করছে।
পশ্চিমা নেতাদের আমন্ত্রণ থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে একাধিক স্তরের ব্যাখ্যা রয়েছে।

প্রথমত, এটি চীনের একটি সুস্পষ্ট বার্তা যে তারা পশ্চিমাদের সঙ্গে ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে আর আগ্রহী নয়। বিগত এক দশকে চীন এবং পশ্চিমা শক্তির মধ্যে প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে উত্তেজনা ক্রমশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রযুক্তি প্রবৃদ্ধি রোধ করতে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ৫জি অবকাঠামোতে হস্তক্ষেপ এবং চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইউরোপও একই পথে হাঁটছে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা পশ্চিমাদের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে আরও শত্রুতামূলক করে তুলেছে। ফলে চীন যখন বিজয় দিবস উপলক্ষে একটি আন্তর্জাতিক আয়োজন করছে, তখন তারা সচেতনভাবেই পশ্চিমাদের বাদ দিয়ে রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমাদের বাদ দেওয়ার মধ্যে চীনের উদ্দেশ্য হলো রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার প্রতি প্রকাশ্য সংহতি প্রদর্শন। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়া ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে, তবে বাস্তবতা হলো রাশিয়া এখনও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির কৌশলগত সহযোগিতায় টিকে আছে। একইভাবে, উত্তর কোরিয়া বহু বছর ধরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে, কিন্তু চীনের আনুষ্ঠানিক মিত্র হিসেবে কৌশলগত প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছে। বেইজিং কুচকাওয়াজে পুতিন ও কিমের প্রকাশ্য উপস্থিতি তাই একটি ঘোষণা—চীন এই দুই দেশের সঙ্গে দৃঢ় অবস্থানে আছে এবং পশ্চিমাদের চাপ উপেক্ষা করতে সক্ষম।
তৃতীয়ত, এই আয়োজন কেবল সামরিক শোভাযাত্রা নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে একটি প্রদর্শনী। শত শত বিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি এবং সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে চীন কেবল অভ্যন্তরীণ জনতাকে শক্তির বার্তা দিচ্ছে না, বরং বাইরের বিশ্বকেও জানাচ্ছে যে তারা অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি সামরিক শক্তিতেও পশ্চিমাদের বিকল্প হয়ে উঠেছে। পুতিনের উপস্থিতি রাশিয়াকে একটি রাজনৈতিক ভরসা দিচ্ছে—যে তারা একা নয়। কিমের উপস্থিতি উত্তর কোরিয়ার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করছে—যে তারা চীনের ছায়াতলে বিশ্ব রাজনীতিতে টিকে থাকবে।

চীন এই পুরো আয়োজনের মাধ্যমে আসলে গ্লোবাল সাউথকে বার্তা দিচ্ছে। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ পশ্চিমাদের একচ্ছত্র প্রভাব থেকে বেরিয়ে নতুন বিকল্প শক্তির সন্ধান করছে। চীন সেই বিকল্পের নেতৃত্ব দাবি করছে। “আমরা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বাইরে এক নতুন বিশ্ব তৈরি করতে পারি”—এটাই হচ্ছে চীনের মূল রাজনৈতিক বক্তব্য। ফলে কুচকাওয়াজে পশ্চিমাদের বাদ দিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই চিত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, যেটি এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, এখন কোয়াড (QUAD) জোটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কৌশলগতভাবে জড়িত। সীমান্তীয় উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা ভারতকে চীনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তবুও ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্মে ভারত এবং চীন একইসঙ্গে কাজ করছে। এই দ্বৈত অবস্থান ভারতের জন্য একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান ইতিমধ্যেই চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) অন্যতম বড় প্রকল্প, যা পাকিস্তানকে সরাসরি চীনের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও জটিল। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমশ বেড়েছে। চীনা বিনিয়োগ, করিডোর প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে চীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু একই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান ক্রেতা। পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া মানে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বিরাট চাপ তৈরি হওয়া। ফলে বাংলাদেশকে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে—চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে আবার পশ্চিমাদের বিরাগভাজন না হওয়া।
ভবিষ্যতে যদি চীন-রাশিয়া অক্ষ আরও শক্তিশালী হয়, তবে বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়বে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চল চীনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা চাইবে এখানে নিজেদের নৌ-প্রভাব বজায় রাখতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি এবং ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থ বাংলাদেশকে সেই প্রভাবক্ষেত্রেও জড়াবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতি হতে হবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বাস্তববাদী। অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা ছাড়া বাংলাদেশের বিকল্প কোনো পথ নেই।

শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ—দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও একই দ্বিধায় পড়েছে। শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে, ফলে বেইজিংয়ের প্রভাব সেখানে দিন দিন বাড়ছে। নেপালও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হয়েছে। এর মানে হলো, গোটা দক্ষিণ এশিয়া চীনের প্রভাব বলয়ের দিকে এগোচ্ছে। পশ্চিমারা এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে চীন অনেক বেশি সক্রিয়।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের এই কুচকাওয়াজ পশ্চিমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। প্রযুক্তি ও উচ্চমানের শিল্পক্ষেত্রে চীনের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। কিন্তু চীনের পাল্টা কৌশল হলো রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং গ্লোবাল সাউথকে ঘিরে একটি বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামরিক একতা। এই একতা যদি আরও দৃঢ় হয়, তবে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা আর কেবল ধারণা নয়, বাস্তবতা হয়ে উঠবে।
পুতিন, কিম এবং শি জিনপিংয়ের প্রকাশ্য উপস্থিতি এই বার্তাটিই প্রতিফলিত করছে। পশ্চিমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নতুন বিকল্প খুঁজছে। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া পশ্চিমাদের চাপ সত্ত্বেও টিকে থাকার কৌশল নিয়েছে। চীন এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে পুনর্নির্মাণ করছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানে বার্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতি প্রধানত রপ্তানিনির্ভর, আর সেই রপ্তানি বাজার পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু একইসঙ্গে চীন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন, সামরিক সহযোগিতা ও কৌশলগত বিনিয়োগের প্রধান উৎস। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতিকে হবে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার হারানো যাবে না, অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তাকেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব, যা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।

চীনের কুচকাওয়াজ আসলে কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং এটি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতীক। এতে চীনের সর্বশেষ সামরিক প্রযুক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি বৈশ্বিক শক্তি রাজনীতির নতুন মানচিত্র আঁকা হচ্ছে। এটি পশ্চিমাদের কাছে একটি ঘোষণা—চীন ও তার মিত্ররা বিকল্প শক্তির অক্ষ তৈরি করেছে, যেটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সামরিক কুচকাওয়াজ বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের বাদ দিয়ে রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং গ্লোবাল সাউথকে গুরুত্ব দেওয়া, সামরিক শক্তির প্রকাশ্য প্রদর্শন এবং কৌশলগত বার্তার সংমিশ্রণ—সবকিছু মিলিয়ে এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, এখন এমন এক কূটনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ভারসাম্য রক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে একসঙ্গে সামলাতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই এই কুচকাওয়াজ কেবল চীনের শক্তির প্রদর্শনী নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্তের ঘোষণা—যেখানে পশ্চিমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে বহুমেরু বাস্তবতা সামনে চলে আসছে।









