রবিবার, ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মন্ত্রণালয়ের ভুয়া প্রজ্ঞাপন বানিয়ে প্রতারণা, অবশেষে গ্রেপ্তার

ব্যুরো চীফ, বরিশাল:

মন্ত্রণালয়ের ভুয়া প্রজ্ঞাপন তৈরি করে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিলেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রামের জহুর আলী সরদারের ছেলে মিজানুর রহমান। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।

শনিবার (৩০ আগস্ট) দিবাগত রাতে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বরিশাল এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন-উল ইসলাম জানান, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর ২১ থেকে ২৫ পর্যন্ত ধারায় অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে বরিশাল অঞ্চলের পাট অধিদপ্তরের মুখ্য পরিদর্শক বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর ২৯ আগস্ট রাতে মাধবপাশা এলাকা থেকে মিজানুরকে গ্রেপ্তার করে পরদিন আদালতে সোপর্দ করা হয়।

ওসি জানান, প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে মিজানুর রহমান ব্যক্তিগত স্বার্থে অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার জন্য জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া সরকারি প্রজ্ঞাপন তৈরি করেছিলেন। এই প্রজ্ঞাপন ব্যবহার করে তিনি স্থানীয় লোকজনকে বিভ্রান্ত করে প্রতারণার ফাঁদ পাতার চেষ্টা করছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিজানুর রহমান রাজনৈতিক সুবিধাবাদী। ক্ষমতায় যে দল আসে, সেই দলের নেতা সেজে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন তিনি। গত বছরের ৫ আগস্টের আগে তিনি ছিলেন পদবিহীন যুবলীগ নেতা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতার ছত্রছায়ায় তিনি চন্দ্রদ্বীপ হাইস্কুল ও কলেজের সভাপতি হওয়ার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে নতুন কৌশলে প্রতারণার পরিকল্পনা করেন।

মিজানুর ভুয়া প্রজ্ঞাপন বানিয়ে দাবি করেন, সুইডেন ও স্পেনের দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় শিল্পাঞ্চল স্থাপনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। জমি অধিগ্রহণ ও জনবল নিয়োগসহ প্রকল্পের সব কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য তাকে মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান নিয়োগ দিয়েছে সরকার—এমন মিথ্যা তথ্য উল্লেখ করে তিনি ফেসবুকে ওই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেন।

প্রজ্ঞাপনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেলে বিষয়টি পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নজরে আসে। এরপর তদন্তে বেরিয়ে আসে প্রতারণার পরিকল্পনার সত্যতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুরুতেই বিষয়টি ধরা না পড়লে জমি অধিগ্রহণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার নামে মাধবপাশার শত শত মানুষ প্রতারণার শিকার হতো।

বরিশাল অঞ্চলের পাট অধিদপ্তরের মুখ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “গত ২৮ আগস্ট সকালে মহাপরিচালক আমাকে ফোন করে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। সরেজমিনে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মিজানুর রহমানের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হই। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে মামলা দায়েরের নির্দেশ আসে।”

গ্রেপ্তারের পর থানায় সাংবাদিকদের প্রশ্নে মিজানুর রহমান কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে পরে আইনজীবীর মাধ্যমে বক্তব্য দেবেন।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় বরিশালের সুরভী লঞ্চ কোম্পানির ম্যানেজার ছিলেন মিজানুর। সেখানে সাংবাদিক নির্যাতনসহ নানা অভিযোগে চাকরিচ্যুত হন তিনি। এরপর গ্রামের বাড়ি মাধবপাশায় ফিরে টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। যদিও দলীয়ভাবে তার কোনো পদবী ছিল না।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি বিএনপির একটি গ্রুপের ঘনিষ্ঠ হন। ওই গ্রুপের প্রভাবে চন্দ্রদ্বীপ হাইস্কুল ও কলেজের সভাপতি হওয়ার জন্য ব্যাপক তদবির ও চাপ প্রয়োগ করেন তিনি। অভিযোগ ওঠে, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপরও তিনি অবৈধ চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ তার নাম প্রথমে প্রস্তাব করে শিক্ষা বোর্ডে পাঠালেও বিএনপির দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে অবশেষে মাউশি নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে সভাপতি মনোনীত করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মিজানুর জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন, তবে তদন্তে অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ