নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প বহুদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে এই শিল্পের সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর (২০২৪) যে ধস নেমেছিল, তা উদ্যোক্তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে রফতানি আয় কমেছিল ১০ শতাংশের বেশি। বাজারের এই ধসকে অনেকেই বাংলাদেশের অবস্থানের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সেই মন্দা কাটিয়ে দৃঢ় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি করেছে প্রায় ৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৬৬ শতাংশ—যা শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, কৌশলগতভাবেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত বহন করছে।

পতন থেকে শীর্ষে ওঠা
২০২৪ সালের মন্দা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়; ভিয়েতনাম, চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর রফতানিতেও প্রভাব ফেলেছিল। তবে বাংলাদেশের পতন তুলনামূলক বেশি ছিল। শিল্প উদ্যোক্তারা তখন আশঙ্কা করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র তার উল্টো। এক বছরের ব্যবধানে ১০ শতাংশের বেশি পতন থেকে ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি—এটি নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী ‘কমব্যাক স্টোরি’।
বাজার পরিবর্তনের সুযোগ
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং চীনের উচ্চ উৎপাদন ব্যয় মার্কিন ক্রেতাদের অন্য দেশে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। ফলে বাংলাদেশের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নতুন সুযোগ পাচ্ছে। এ সুযোগ কেবল পরিমাণে নয়, গুণগত মান ও সরবরাহ শৃঙ্খলেও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ এনে দিচ্ছে।
চীনের রফতানি এই সময়ে ২১ শতাংশের বেশি কমে গেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ একই সঙ্গে উৎপাদন দক্ষতা, প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং সাসটেইনেবল প্রোডাকশন মডেল ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা আমাদের শক্তিশালী অবস্থানকে আরও দৃঢ় করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বাংলাদেশের সুবিধা
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের পোশাকের ওপর শুল্ক ২০ শতাংশ, যা চীনের তুলনায় ১০ শতাংশ কম। ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ক্ষমতাকে আরও এগিয়ে দিয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, ইতোমধ্যে মার্কিন ক্রেতারা অর্ডার বাড়াতে শুরু করেছেন। কিছু ক্রেতা ভারতের বাজার থেকে অর্ডার সরিয়ে বাংলাদেশে আনছেন। আবার কৌশলগত বিনিয়োগে ভারতীয় ও চীনা বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে আগ্রহী হচ্ছেন।
উদ্যোক্তাদের আস্থা ও প্রস্তুতি
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, “বাংলাদেশ এখন শুধু সস্তা পোশাকের বাজার নয়; মানসম্পন্ন, সময়মতো সরবরাহ ও সাসটেইনেবল উৎপাদন মডেলের কারণে ক্রেতারা আমাদের প্রতি আস্থা রাখছেন।”
দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই বাড়তি অর্ডারের সুবিধা পাচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি করে ক্রেতাদের অর্ডার পূরণে কাজ করছে। এই প্রবণতা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
তবে এই উত্থানের মধ্যেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক বাজারে ভোক্তারা উচ্চমূল্য কতটা মেনে নেবেন, তা অনিশ্চিত। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং শ্রমিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিক নজরদারি বাড়ছে। ফলে এই শিল্পকে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সাসটেইনেবল প্রোডাকশন মডেল ও প্রযুক্তি-নির্ভর উৎপাদন জোরদার করা জরুরি।

এছাড়া বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা দূর করা হলে পোশাকশিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে ব্র্যান্ডিং, গবেষণা ও উদ্ভাবনেও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
মাত্র এক বছরে পতন থেকে শীর্ষে ওঠা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের গল্প শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের নয়, কৌশলগত দূরদর্শিতারও উদাহরণ। বৈশ্বিক বাজারে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আগামী এক দশকেও বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে থাকবে। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ এখন হাতের নাগালেই।








