শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের কবি: জন্মদিনে সাঈদ আনোয়ারকে স্মরণ

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে 

১৯৬৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের করাচিতে জন্মেছিলেন সাঈদ আনোয়ার। পাকিস্তানি ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন ওপেনার নন, ছিলেন ব্যাট হাতে কবি। তাঁর ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসা শটগুলো যেন ছিল শিল্পীর আঁকা ছবি—হালকা বাঁকা কাভার ড্রাইভ, স্কয়ার কাট, কিংবা মিড-উইকেটের ওপর দিয়ে তোলা শট। ক্রিকেটের ব্যস্ত সময়ে তিনি ছিলেন প্রশান্তির প্রতীক। আজ সাঈদ আনোয়ারের জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই সোনালি অধ্যায়।

সাঈদ আনোয়ার শুরুতে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে ভাবেননি। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নও দেখতেন। তবে স্থানীয় ক্রিকেটে দ্রুত সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের নজরে আসেন। ১ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হয় তাঁর। পরের বছর টেস্ট দলে ডাক পান। শুরুতে সংগ্রাম করলেও নিজের নান্দনিক শট এবং টেকনিক দিয়ে তিনি দ্রুত সবার মন জয় করেন।

তখনকার পাকিস্তান দল তারকায় ভরা—জাভেদ মিয়াঁদাদ, সেলিম মালিক, রমিজ রাজারা ছিলেন ব্যাটিং স্তম্ভ। তাদের ভিড়ে এক তরুণ বাঁ-হাতি ওপেনার নিজের জায়গা তৈরি করলেন কেবল স্টাইলের জোরে।

১৯৯০ সালের ২২ জানুয়ারি, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে লাহোরে সাঈদ আনোয়ারের ব্যাট থেকে আসে তাঁর প্রথম ওয়ানডে শতক। সেদিন ১২৬ বলে ১২৬ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। পাকিস্তান দলের ওপেনিংয়ে তখনো ছিল অস্থিরতা, কিন্তু এই শতক দলের জন্য নতুন ভরসা এনে দিয়েছিল। ওয়ানডেতে ২০টি শতকের মধ্যে এটিই ছিল সূচনা।

১৯৯৭ সালের ২১ মে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। মঞ্চ চেন্নাইয়ের এমএ চিদাম্বরম স্টেডিয়াম। সেদিন সাঈদ আনোয়ার পাকিস্তানের ইনিংস শুরু করেছিলেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই। কিন্তু ক্রিজে থিতু হতেই শুরু হয় রানবন্যা।

১৪৬ বলে ১৯৪ রানের সেই ইনিংস ক্রিকেট ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। ইনিংসে ছিল ২২টি চার ও ৫টি ছক্কা। ভারতীয় বোলারদের তিনি খেলার মাঠে যেন অনায়াসে শাসন করছিলেন। অনিল কুম্বলে, ভেঙ্কটেশ প্রসাদদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক শান্ত মুখের শিল্পী, যিনি বলের সাথে শুধু টাইমিংয়ের খেলা খেলছিলেন।

স্টেডিয়ামের ভারতীয় দর্শকেরাও দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন আনোয়ারকে। ম্যাচ শেষে কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার বলেছিলেন, “আজ আমরা ক্রিকেটের এক শিল্পকর্ম দেখলাম। সাঈদ আনোয়ারের ব্যাটিংয়ে যে নৈপুণ্য ছিল, তা বিরল।”

সেই ইনিংস দীর্ঘদিন ধরে ছিল ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি পাকিস্তান ক্রিকেটে এক সেরা জুটি হয়ে উঠেছিল আমির সোহেল ও সাঈদ আনোয়ার। তাঁদের আগ্রাসী ব্যাটিং স্টাইল পাকিস্তানের শুরুটা দিত ভয়ংকর রূপে। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাঁদের ১৮৪ রানের জুটি এখনো মনে রেখেছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।

আমির সোহেল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমরা দু’জন বুঝে গিয়েছিলাম, পাওয়ারপ্লেতে যদি রান তুলতে হয়, তাহলে শট খেলতেই হবে। আনোয়ারের ব্যাটিং ছিল শিল্পের মতো, আমি কেবল তার সঙ্গী হতে পেরেছিলাম।”

২০০১ সাল আনোয়ারের জীবনে নিয়ে আসে এক ভয়াবহ অধ্যায়। তাঁর ছোট্ট মেয়ে বিসমাহ মাত্র তিন বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। এই শোক তাঁকে ভিতরে ভিতরে বদলে দেয়। ক্রিকেট মাঠ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান তিনি, ধর্মের প্রতি ঝুঁকেন। পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন, “জীবন তখন আমাকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছে। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা ছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল, আরও বড় কিছু করার আছে।”

২০০৩ সালের বিশ্বকাপ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে। তাঁর শেষ ম্যাচে (জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে) তিনি করেন ৪০ রান।

পরিসংখ্যানের আঙিনায় আনোয়ার:

  • ওয়ানডে: ২৪৭ ম্যাচ, ৮৮২৪ রান, গড় ৩৯.২১, স্ট্রাইক রেট ৮০.৬৭, ২০টি শতক, ৪৩টি অর্ধশতক
  • টেস্ট: ৫৫ ম্যাচ, ৪০৫২ রান, গড় ৪৫.৫২, ১১টি শতক, ২৫টি অর্ধশতক
  • লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট: ৪০০ ম্যাচে ১৩ হাজারের বেশি রান

তাঁর ২০টি ওয়ানডে শতক পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মধ্যে দীর্ঘদিন শীর্ষে ছিল।

সাঈদ আনোয়ারের ব্যাটিং প্রভাব শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতীয় প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি তাঁকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “সাঈদ আনোয়ারের ব্যাটিং দেখলে মনে হতো ক্রিকেট খেলা আসলে এত সহজ। আমরা জানতাম, বলটা যদি অফ স্টাম্পের বাইরে থাকে, সেটা কাভার দিয়ে যাবে।”

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ বলেছিলেন, “তিনি ছিলেন খুবই শান্ত ক্রিকেটার। মাঠে কোনো বাড়াবাড়ি করতেন না। কিন্তু তাঁর ব্যাটিং ছিল ভয়ংকর। আমরা জানতাম, ওকে আউট না করলে ম্যাচ আমাদের জন্য কঠিন।”

ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার পর আনোয়ার নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন ধর্মীয় কার্যক্রমে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোচিং বা প্রশাসনিক দায়িত্বে তাঁকে দেখা যায়নি, তবে তাঁর ক্যারিয়ারের ভিডিও আজও নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের শেখায় যে ব্যাটিং কেবল শক্তি নয়, শিল্পও হতে পারে।

পাকিস্তানি মিডিয়া তাঁকে আজও ‘সর্বকালের সেরা বাঁ-হাতি ওপেনার’ বলে আখ্যায়িত করে।

ক্রিকেটে হয়তো এখন প্রযুক্তি, শক্তি আর আগ্রাসন বেশি। কিন্তু সাঈদ আনোয়ার শিখিয়েছিলেন, শিল্পের সৌন্দর্য দিয়েও জয় করা যায় দর্শকদের মন। তাঁর ব্যাটিং ছিল এক নীরব কবিতা, যা এখনো ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে আছে।

আজ, ৫৭তম জন্মদিনে সাঈদ আনোয়ারকে দৈনিক পথে প্রান্তরে পত্রিকার পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ