দিব্যতনু দাস, বাগেরহাট
বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একটি কমিয়ে তিনটি আসন করার নির্বাচনী সীমানার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের প্রতিবাদে এবং চারটি আসন বহাল রাখার দাবিতে সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল চলছে। হরতালের কারণে শহরের ছোট-বড় সব দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। জেলা নির্বাচন অফিস, আদালত ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে সর্বদলীয় কমিটি, নেতাকর্মী ও জেলাবাসী। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সকাল থেকে শহরের কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড, দশানী মোড়, খান জাহান আলী (রহ.) মাজার মোড়, মুনিগঞ্জ সেতু ও দরটানা টোল প্লাজা ঘুরে দেখা গেছে, দূরপাল্লাসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। জেলার ফকিরহাট, মোল্লাহাট, চিতলমারী, মোংলা, রামপাল, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা ও সদর উপজেলার অধিকাংশ সড়কে স্বতঃস্ফূর্ত জনসাধারণ গাছ ফেলে ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ-সমাবেশ করছেন। দৃশ্যত এই হরতালের ফলে বাগেরহাট জেলা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আগামীকাল মঙ্গলবার সর্বত্র বিক্ষোভ কর্মসূচি ও সমাবেশ রয়েছে। এরপর বুধবার ও বৃহস্পতিবার টানা দুই দিনের হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম. এ সালাম বলেন, “নির্বাচন কমিশন জনমানুষের দাবি উপেক্ষা করে এই আসন বিন্যাস করেছে। গণমানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। এতেও যদি নির্বাচন কমিশন চারটি আসন ফিরিয়ে না দেয়, তাহলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত গেজেটের পর থেকে আমরা রাজপথে আছি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এরপরও নির্বাচন কমিশন আমাদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেয়নি। অবিবেচনাপ্রসূতভাবে একটি আসন বিন্যাস করেছে।”
এর আগে রোববার দুপুরে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটি। সম্মেলন থেকে হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ, মিছিলসহ সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বাগেরহাট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটির নেতারা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সম্মিলিত কমিটির কো-কনভেনর এম. এ সালাম, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা রেজাউল করিম, সেক্রেটারি শেখ মোহাম্মদ ইউনুস আলী, বিএনপি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, ব্যারিস্টার জাকির হোসেন, খাদেম নিয়ামুল নাসির আলাপ, শাহেদ আলী রবি, খান মনিরুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম ফরাজি, ফকির তারিকুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম গোড়া, নাসির আহমেদ মালেক, জামায়াত নেতা মঞ্জুরুল হক রাহাতসহ সর্বদলীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ।
দীর্ঘদিন ধরে বাগেরহাটে চারটি আসন ছিল। গেল ৩০ জুলাই দুপুরে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যে একটি কমিয়ে তিনটি আসন করার প্রাথমিক প্রস্তাব দেয় নির্বাচন কমিশন। এরপর থেকেই বাগেরহাটবাসী আন্দোলন শুরু করে। চারটি আসন বহাল রাখার দাবিতে নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন বাগেরহাটের নেতারা। তার বিপরীতে ৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন শুধু সীমানা পরিবর্তন করে তিনটি আসন বহাল রেখে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের এই আসন বিন্যাস গণমানুষের দাবিকে উপেক্ষা করেছে।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা রেজাউল করিম বলেন, “আমাদের কান্নার শব্দটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। এরপরও যদি নির্বাচন কমিশনের বোধোদয় না হয়, তাহলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম. এ সালাম বলেন, “চারটি আসন ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছি। এই কমিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতে যাবে।”
বাগেরহাট জেলা বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জাকির হোসেন বলেন, “নির্বাচন কমিশন বাগেরহাটের মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। চারটি আসন বহাল রাখার দাবিতে হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভের পাশাপাশি স্বল্প সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতে রিট করা হবে।”
চূড়ান্ত সীমানার গেজেট অনুযায়ী বর্তমান আসনের সীমানা:
- বাগেরহাট-১: বাগেরহাট সদর, চিতলমারী, মোল্লাহাট
- বাগেরহাট-২: কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা
- বাগেরহাট-৩: ফকিরহাট, রামপাল, মোংলা
১৯৬৯ সাল থেকে বাগেরহাটে ৪টি আসন ছিল। তখনকার সীমানা:
- বাগেরহাট-১: চিতলমারী, মোল্লাহাট, ফকিরহাট
- বাগেরহাট-২: বাগেরহাট সদর, কচুয়া
- বাগেরহাট-৩: রামপাল, মোংলা
- বাগেরহাট-৪: মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা








