বুধবার, ২৫শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কৃষকদল নেতা হত্যা মামলায় জামায়াত নেতাদের আসামি করায় ক্ষোভ

ব্যুরো চীফ, বরিশাল

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সৈয়দকাঠী ইউনিয়ন কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ (৫৫) হত্যা মামলাকে ঘিরে অপরাজনীতি শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দুইজন বিএনপি কর্মীর বাগবিতণ্ডার জেরে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মসজিদের ইমামসহ জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতাকর্মীকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রত্যক্ষদর্শী ইব্রাহীম হাওলাদার স্থানীয় সংবাদকর্মীদের কাছে বলেন, শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে করফাকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে স্থানীয় বিএনপি কর্মী দেলোয়ার হোসেন ঘরামীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথাকাটাকাটি হয় কৃষকদল নেতা আবদুল লতিফের।

একপর্যায়ে দেলোয়ার হোসেন ঘরামী আবদুল লতিফকে কয়েকটি থাপ্পড় মারেন। এতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে উদ্ধার করে বানারীপাড়া উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় আল মামুন, ইসমাইল চৌকিদার, হিরু হাওলাদার ও মনির হোসেন। অথচ দায়েরকৃত মামলায় প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষী করা হয়নি।

ইব্রাহীম হাওলাদার বলেন, “আবদুল লতিফকে চরথাপ্পড় মেরেছে দেলোয়ার। কোনো সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটেনি। সেখানে উপস্থিত অন্যরা উভয়কে ছাড়িয়ে দেয়। আমি নিজেই আবদুল লতিফকে হাসপাতালে নিতে সাহায্য করেছি। অথচ মামলায় আমাকেও আসামি করা হয়েছে। তাছাড়া জামায়াতের কয়েকজন নেতাকেও আসামি করা হয়েছে, যারা ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। এমনকি মসজিদের ইমাম সাহেবকেও আসামি করা হয়েছে।”

করফাকর বায়তুল আমান জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা জাহিদুল ইসলাম বলেন, “লতিফ ভাই আমার মসজিদের মুসল্লি ছিলেন। আসরের নামাজের পর মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি, লতিফ ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অথচ আমাকেও ওই হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।”

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “লতিফের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি মহল মামলা বাণিজ্য শুরু করতে চাইছে। নিহতের পরিবারকে জিম্মি করে নিরীহ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এতে অনেক মানুষ গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়িছাড়া।”

সৈয়দকাঠী ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মোহাম্মদ ফেরদাউস বলেন, “ঘটনার দিন আমি উজিরপুরে ছিলাম। পরে এলাকায় ফিরে মৃধাবাড়ি মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করি। এরপর শুনতে পাই করফাকর স্কুল প্রাঙ্গণে মারামারি হয়েছে। আমি ঘটনাস্থলেই যাইনি। অথচ আমিসহ জামায়াতের নায়েবে আমির হাফেজ নাজিমউদ্দিন ও জামায়াত কর্মী জাহিদুল ইসলামকে ওই হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “বিএনপি নেতারা আমাদের হত্যা মামলায় আসামি করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে মিছিল বের করছে। বাদীপক্ষকে জোর করে জামায়াতের লোকদের আসামি করেছে। এতে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং ন্যায়বিচারও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ অভিযুক্ত দেলোয়ার বিএনপির কর্মী। তাকে এখন জামায়াত হিসেবে সাজিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া হচ্ছে।”

সৈয়দকাঠী ইউনিয়ন জামায়াতের নায়েবে আমির হাফেজ নাজিমউদ্দিন বলেন, “ঘটনাটি ঘটার অনেক সময় পরে আমি খবর পাই। অথচ আমাকেও আসামি করা হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতারা এটি নিয়ে রাজনীতি করছে। তারা নিহতের পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্দোষ মানুষকে আসামি করেছে। নিরপেক্ষ তদন্ত করলে সব বেরিয়ে আসবে।”

মামলার বাদী ও নিহতের স্ত্রী পারভীন বেগম সাংবাদিকদের বলেন, “আমি তিনজন আসামির নাম দিয়েছি। এর মধ্যে জামায়াতের কারো নাম ছিল না। অন্য নামগুলো পুলিশ ও বিএনপি নেতারা অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমি ন্যায়বিচার চাই।”

সৈয়দকাঠী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, “যাদের আসামি করা হয়েছে তারা কেউ ঘটনাস্থলে ছিল, কেউ কাছাকাছি ছিল। আসামিরা সবাই করফাকরের বাসিন্দা। আমরা চাইলে পুরো ইউনিয়নের জামায়াতকর্মীদের আসামি করতে পারতাম, কিন্তু করিনি।”

বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ মৃধা বলেন, “আমরা এটি নিয়ে কোনো রাজনীতি করছি না। ভুক্তভোগী পরিবারকে সহযোগিতা করছি। আবদুল লতিফ ছিলেন দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতা।” তিনি দাবি করেন, অভিযুক্ত দেলোয়ার বিএনপির কর্মী নন, বরং জামায়াতের সমর্থক।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বানারীপাড়া থানার এসআই আরাফাত হাসান বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বানারীপাড়া থানার ওসি (তদন্ত) শতদল মজুমদার বলেন, “ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার মামলা দিয়েছে। আসামি ও সাক্ষীদের নাম তারাই দিয়েছে। তবে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি আসামি হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”

উল্লেখ্য, সৈয়দকাঠী ইউনিয়ন কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ২৮ সেপ্টেম্বর নিহতের স্ত্রী পারভীন বেগম বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২৯ সেপ্টেম্বর ভোরে মামলার এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি তুহিনকে ভোলা থেকে র‌্যাব-৮ সদস্যরা অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ