ব্যুরো চীফ, বরিশাল:
বরিশালে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা লিটন সিকদার লিটুকে (৪২) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনার পর পুরো এলাকা পুরুষ শুন্য হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (১ আগস্ট) বিকেলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের পূর্ব বিল্ববাড়ি এলাকার মানুষজন বিশেষ করে পুরুষ সদস্যরা পুলিশের গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।
এরপূর্বে বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) সন্ধ্যায় পুলিশের উপস্থিতিতে বিল্ববাড়ি এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলায় লিটন সিকদার লিটুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় আহত হন তার ছোট ভাই সুমন, বোন মুন্নি বেগম এবং তাদের বৃদ্ধা মা।
ঘটনার পরই বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাতজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং কেউ এই হত্যাকান্ডে সম্পৃক্ত প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন এয়ারপোর্ট থানার ওসি মো. জাকির সিকদার।
সূত্রমতে, এ হত্যাকান্ডের পরপরই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি বাড়ি এবং সন্দেহভাজন ঘরগুলোতে চলছে তল্লাশি অভিযান। পুলিশের একাধিক টিম হত্যাকারীদের সনাক্ত করে গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছেন। ফলে আতঙ্কিত হয়ে বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদস্থানে চলে গেছে। বিশেষ করে পুরুষ সদস্যদের দেখা যাচ্ছে না গ্রামে।
শুক্রবার দিনভর কিছু দোকানপাট খোলা দেখা গেলেও মানুষের মধ্যে ছিলো আতঙ্কের ছাপ। কেউ সহজে কথা বলতে চাচ্ছেন না। নিহত লিটনের পরিবারের সদস্যরা এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। এরইমধ্যে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে স্থানীয়দের সাথে কথা বলছে তদন্তকারী দল।
বরিশাল এয়ারপোর্ট থানার ওসি জাকির সিকদার বলেন, এখন পর্যন্ত সাতজনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সাথে প্রকৃত দায়ীদের সনাক্ত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তায় আমরা বদ্ধপরিকর। এ ঘটনায় নিহতের পরিবার পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
সূত্রমতে, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্ধের জেরধরে বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের পূর্ব বিল্ববাড়ি গ্রামের নজির সিকদারের ছেলে নগরীর ২৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিস্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক লিটন সিকদার লিটুকে (৪২) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশের উপস্থিতিতে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যাসহ নিহতের ছোট ভাই সুমন সিকদার (৩৫) ও বোন মুন্নি বেগমকে (৩৮) কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। এসময় প্রতিপক্ষের হামলাকারীরা লিটুর ঘরে ভাঙচুরসহ লুট করে তার মোটরসাইকেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত মুন্নি বেগম জানান, একই গ্রামের বাসিন্দা তার স্বামী জাকির হোসেন গাজী গোপনে আরেকটি বিয়ে করেন। এনিয়ে তাদের পারিবারিক বিরোধ হয়। সম্প্রতি তিনি ও তার স্বামী পাল্টাপাল্টি মামলা করেন।
মামলার আসামি হিসেবে বৃহস্পতিবার আদালত থেকে তারা জামিন নিয়ে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশের সহায়তায় বাড়িতে আসেন। তখন পুলিশের সামনে একদল লোক তাদের ওপর হামলা চালিয়ে ঘর ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে। এসময় তার ভাই লিটন সিকদার লিটুকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যাসহ তাদের কুপিয়ে জখম করা হয়।
অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, লিটন সিকদার লিটুর বাড়িতে হামলা করছে একদল লোক। তখন এয়ারপোর্ট থানার এসআই শহীদুল ইসলাম পিকআপে উঠে যাচ্ছে। এ সময় একজন লোক তাকে বলছে- আপনি এ পরিস্থিতিতে কোথায় যাচ্ছেন। আপনি ওকে (লিটু) গ্রেপ্তার করে নিয়ে যান, নয়তো লিটুকে মেরে ফেলা হবে। ভিডিওতে দেখা গেছে, এসআই শহীদুল ইসলামের সামনে বসেই উত্তেজিত লোকজন লিটুর বাড়ি ভাঙচুর করছে।
এ ব্যাপারে এসআই শহীদুল ইসলাম বলেন, আমি লিটুর বোনের দায়ের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম। আমি চলে আসার পর হামলার ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে দ্বিতীয়বার ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়েছি।
নিহত লিটুর ঘনিষ্টজনেরা জানিয়েছেন, হামলার ঘটনার শুরুর দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলেই ছিল, তাদের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হলেও থাকেনি। পরে হামলা শুরু হলে আমরা সবাই ঘরের মধ্যে আশ্রয় নেই কিন্তু হামলাকারীরা দরজা-জানালা ভেঙে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে হামলা চালায়। ওইসময় পুলিশকে ফোন করা হলেও তারা আসেনি। হামলার শেষ পর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, কুপিয়ে লিটুর একটি হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এছাড়াও শরীরের বিভিন্নস্থানে কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। তার ছোট ভাই ও বোনকেও কুপিয়ে জখম করা হয়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, পারিবারিক বিরোধ নিয়ে গ্রামে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও এয়ারপোর্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তেমন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে মহানগর পুলিশের এয়ারপোর্ট থানার ওসি জাকির শিকদার বলেন, পারিবারিক বিরোধ নিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে। আমার পক্ষে যা করার মামলা নেয়া। স্বামী ও স্ত্রী দুইপক্ষের মামলা নেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ নিয়ে গ্রামে দুইটি পক্ষ হয়েছে। জাকিরের পক্ষের লোকজন হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুরসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করেছে। এরমধ্যে লিটু নিহত হয়েছে। দুইজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এরপূর্বে লিটু ও তার লোকজনে জাকির সিকদারকে আটক করে মারধরসহ বিদ্যুত শক দিয়েছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে।








