হিমালয় সুমু, পথে প্রান্তরে:
একটা ১৪ বছরের ছেলে। নাম মাকিন। চোখে তার পৃথিবী দেখার হাজারটা স্বপ্ন, বুকভরা কৌতূহল, স্কুলব্যাগে বইয়ের সঙ্গে গুঁজে রাখা কিছু গল্পের খাতা।
সে ছিল মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বড় হয়ে কী হবে? হয়তো বিজ্ঞানী, হয়তো ডাক্তার, হয়তো ইঞ্জিনিয়ার, হয়তো কবি, হয়তো শুধু একটা ভালো মানুষ— কে জানে! জীবন যে কখন কোন বাঁকে মোড় নেয়, সেটা কেউ কি জানে?
২৫ জুলাই দুপুর ১টা। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিঃশব্দ এক কক্ষে শ্বাস থেমে গেল মাকিনের। আগুনে ঝলসে যাওয়া শরীর আর লড়তে পারেনি। ২১ জুলাই বিমান দূর্ঘটনার পর থেকে সে চেষ্টা করেছে, বাঁচার জন্য। ডাক্তার, নার্স, স্যালাইন, অক্সিজেন, আর বারবার ফিসফিস করে বলা— “বাবা কই? মা কই?” — সব মিলিয়ে একটা অসহ্য যুদ্ধ।
মাকিনের শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। তার যন্ত্রণার তীব্রতা হয়তো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। হয়তো এই ছেলেটিই ক্লাসে ফিরে বন্ধুকে বলার জন্য জমিয়ে রেখেছিল একটা ছোট গল্প— স্কুল মাঠে কিছু নতুন ঘাস গজিয়েছে, যেখানে হেঁটে গেলে পায়ের নিচে টুংটাং করে সুর বেজে ওঠে।
মাকিনের বাড়ি গাজীপুরের কোনাপাড়ায়। বাবা মোহাম্মদ হোসাইন হয়তো এখনো ভাবছেন, “আমার ছেলে তো এমন ছিল না! ওর হাসি, ওর দৌড়, ওর কথা বলা— সব তো এখনো আমার চোখের সামনে।”
একে একে নিভে যাচ্ছে মাইলস্টোনের প্রদীপগুলো। আগুনে দগ্ধ যে কিশোর-কিশোরীরা এখনো লড়ছে, তাদের জন্য হাসপাতালের প্রতিটি রাত দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। মাকিন ছিল তাদেরই একজন। তার হারিয়ে যাওয়াটা যেন নিছক এক মৃত্যুর খবর নয়— এটা এক পুরো প্রজন্মের স্বপ্নে আগুন লাগার গল্প।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানান, মাকিন তাদের চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ জুলাই দুপুর ১টার দিকে মৃত্যুবরণ করে। এই দুর্ঘটনায় বার্ন ইনস্টিটিউটে এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, সব মিলিয়ে ৩৩ জন।
কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় কিছু থেকে যায়— একটি নাম, একটি জীবন, একটি কিশোরের না বলা গল্প।
হয়তো মাকিনের টেবিলের ডায়েরিতে লেখা আছে—“আমি বড় হয়ে আকাশে উড়তে চাই।”
কে জানে, সেই আকাশেই কি না আজ মাকিন হারিয়ে গেল চিরদিনের জন্য…”আকাশে ওড়ে শিশুরা, চোখে স্বপ্ন, হাতে তারা। তারা পড়ে না আর কোনো বই, তারা হারিয়ে যায় মেঘের ভেতর…”








