মলয় বিকাশ দেবনাথ – ব্রিটেনের দীর্ঘতম সময়ের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা গেছেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে অ্যাবারডিনশায়ারে নিজস্ব বাসভবন বালমোর্যাল ক্যাসলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পিতা রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর ১৯৫২ সালে ব্রিটেনের রানি হিসেবে দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক হয়। ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় সিংহাসনে ছিলেন রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর।
বৃহস্পতিবার রাতে রানির মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পরপরই শোক প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় তারা রানির বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শুক্রবার (৯ সেপ্টেম্বর) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুতে তিন দিন শোক পালন করা হবে। এ সময়ে বাংলাদেশের সব সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। রানির বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া রাণীর মৃত্যুতে বিশে^র অনেক দেশই রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করছে।

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসনে ৭০ বছরপূর্তি প্লাটিনাম জুবিলি উদযাপন অনুষ্ঠানমালা ছিল এ বছরেরই ২ থেকে ৫ জুন। এই উদযাপনের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ছোট বোন, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠকন্যা শেখ রেহানা।

উল্লেখ্য ১৯৬১ ও ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সফর করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ইতোমধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞীর সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানের একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
রাজতন্ত্রের সকল ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন রাণী এলিজাবেথ ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার প্রভাব যখন ক্রমশ কমে আসছে, সমাজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল, রাজতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তখনও অনেকের কাছে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জনপ্রিয়তা কমেনি। ব্রিটেনের রাজসিংহাসনে নিজ কর্তৃত্বে তিনি অটল থেকেছেন। অথচ তার জন্মের সময়ও কেউ ভাবেনি তার অপেক্ষায় রয়েছে ব্রিটিশ সিংহাসন। এলিজাবেথ আলেকজান্দ্রা মেরি উইন্ডসর জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ২১শে এপ্রিল। তার বাবা অ্যালবার্ট, ডিউক অব ইয়র্ক। মা এলিজাবেথ বোওজ লিওন। এই দম্পতির প্রথম সন্তান তিনি। অ্যালবার্ট ছিলেন পঞ্চম জর্জের দ্বিতীয় সন্তান। সূত্র: বিবিসি বাংলা

রানি এবং তার বোন মার্গারেট দুই জনই লেখাপড়া শিখেছেন বাড়িতে। রানির যখন ছয় বছর বয়স তখন তার ঘোড়ায় চড়া বিষয়ক প্রশিক্ষককে তিনি বলেছিলেন তিনি ‘গ্রামের গৃহিণী হতে চান যার অনেকগুলো ঘোড়া ও কুকুর থাকবে।’
বলা হয় খুবই ছোটবেলা থেকেই তিনি অসাধারণ দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন। ব্রিটেনের ভাবী প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ‘তার চরিত্রে যে কর্তৃত্ববোধ ছিল, তা একজন শিশুর পক্ষে ছিল খুবই আশ্চর্যজনক।’
স্কুলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও ভাষাজ্ঞানে এলিজাবেথের ভালো দখল ছিল। তিনি সাংবিধানিক ইতিহাস পড়েছিলেন বিশদভাবে।
রাণীর প্রারম্ভিক জীবন ১৯৩৬ সালে রাজা পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর তৃতীয় এডওয়ার্ড উপাধি পান রাজা ডেভিড। তবে দুই বার বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়া আমেরিকান এক ধনী রমণী ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে তার বিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় সে বছরই তাকে সিংহাসন ত্যাগ করতে হয়। এলিজাবেথের বাবা ডিউক অফ ইয়র্ক অনিচ্ছার সঙ্গে সিংহাসনে বসেন রাজা ষষ্ঠ জর্জ হিসেবে। তার অভিষেক অনুষ্ঠান কিশোরী এলিজাবেথকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। রাজা ষষ্ঠ জর্জ, তার স্ত্রী ও দুই কিশোরী কন্যাকে নিয়ে যখন রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে ইউরোপে ঘুরছেন, তখন ১৯৩৯ সালে ইংল্যান্ডেই এলিজাবেথের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে গ্রিসের যুবরাজ প্রিন্স ফিলিপের, যিনি ছিলেন সম্পর্কে তার কাজিন।

সেটাই যে তাদের প্রথম সাক্ষাৎ ছিল তা নয়, তবে সেই প্রথম এলিজাবেথ, ফিলিপ সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এলিজাবেথের বয়স যখন ১৮, তখন ১৯৪৪ সালে ফিলিপের প্রতি তার প্রণয় গভীর হয়ে ওঠে। তিনি ঘরে ফিলিপের ছবি রাখতেন, দুজন দুজনকে চিঠি লিখতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে তরুণী প্রিন্সেস এলিজাবেথ আধাসামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে লরি চালানোর শিক্ষা নেন। যুদ্ধ শেষে প্রিন্স ফিলিপকে তিনি বিয়ে করতে চাইলে তাকে বেশ বাধার মুখে পড়তে হয়। এলিজাবেথ ছিলেন রাজার অনেক আদরের কন্যা। ফিলিপের বিদেশি বংশ পরিচয়ের কারণে রাজা তার হাতে মেয়েকে তুলে দিতে রাজি হননি। কিন্তু তাদের ইচ্ছারই জয় হয় শেষ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালের ২০শে নভেম্বর এলিজাবেথ ও ফিলিপ ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফিলিপের উপাধি হয় ডিউক অফ এডিনবারা। তিনি নৌবৈাহিনীর কর্মকর্তা পদে বহাল থাকেন।
বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর তারা স্বাভাবিক বিবাহিত জীবন কাটান। এ সময়ই তাদের প্রথম পুত্র চার্লস ও কন্যা অ্যান জন্ম নেন। ১৯৫২ সালে যখন এলিজাবেথের বয়স ২৫, তখন রাজা ষষ্ঠ জর্জ ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যা নেন। এলিজাবেথ তার স্বামীকে নিয়ে বিদেশ সফরে যান বাবার হয়ে দায়িত্ব পালন করতে। চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করে রাজা তাকে বিমানবন্দরে বিদায় জানাতে গিয়েছিলেন। সেটাই ছিল পিতা ও কন্যার শেষ সাক্ষাৎ।
এলিজাবেথ কেনিয়ায় বসে পিতার মৃত্যু সংবাদ পান। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসেন তিনি ব্রিটেনের রানি হিসেবে। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘এক অর্থে আমার কোনও শিক্ষানবিশী হয়নি। আমার বাবা মারা যান খুব অল্প বয়সে। কাজেই অনেকটা হঠাৎ করেই দায়িত্ব নিতে এবং সাধ্যমতো দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী হতে হয়েছিল আমাকে।’
অভিষেক
১৯৫৩ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিক অভিষেকে দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসন আরোহণ ও শপথগ্রহণ সেদিন সারা বিশ্ব অধীর আগ্রহ নিয়ে দেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ব্রিটেন তখন প্রচন্ড অর্থনৈতিক দূরাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ভাষ্যকাররা তার অভিষেককে ব্যাখ্যা করেছিলেন ‘নতুন এলিজাবেথান যুগ’ হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ উপনিবেশ তখন গুটিয়ে এসেছে। নতুন রানির দায়িত্ব নিয়ে তিনি যখন ১৯৫৩ সালে কমনওয়েলথ দেশগুলোতে দীর্ঘ সফরে বের হলেন, তখন ভারতীয় উপমহাদেশসহ অনেক দেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে।
রাজতন্ত্র থেকে রাজপরিবার
ক্রমশ রাজতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের অবিচ্ছিন্ন আনুগত্যে বদল আসতে শুরু করে। সমাজের মধ্যে নানা ধ্যানধারনাও দ্রুত বদলাতে থাকে। রানিও যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলান। ক্রমশ রাজতন্ত্রের জায়গা নেয় রাজপরিবার। রানির রাজত্বকালের মূল স্তম্ভ হয়ে ওঠে সাংবিধানিক সততা রক্ষা। তবে সরকারের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে চলে যান রানি। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে রাণীকে সীমাবদ্ধ করে নেন তিনি নিজেই, দেশের সার্বিক ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত থাকা এবং সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে।
১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে, বাকিংহাম প্রাসাদ সিদ্ধান্ত নেয় যে রাজপরিবারকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। রানি এবং তার পরিবারও যে আর পাঁচটা সাধারণ পরিবারের মত ঘরকন্নার নানা কাজ করেন তা দেখাতে বিবিসিকে ‘রয়্যাল ফ্যামিলি’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। রানির দৈনন্দিন ঘর সংসারের নানা ছবি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। অনেকে বলেন, ওই তথ্যচিত্র রাজপরিবারের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। তবে সমালোচকরা কেউ কেউ বলেন, রাজপরিবারকে নিয়ে মানুষের মনে যে দীর্ঘদিন একটা রহস্য ও রোমাঞ্চ ছিল এই ছবি তা ধ্বংস করে দেয়।
রাজ পরিবারের কালো অধ্যায়
রানি এলিজাবেথ তাঁর দায়িত্ব পালনে ছিলেন একনিষ্ঠ। রাষ্ট্রীয় সফরগুলো তিনি অব্যাহত রাখেন। ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্রিটিশ রানি যিনি মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন। এর এক বছরের মধ্যে তার পরিবারে নানা ধরনের কেলেঙ্কারি ও দুর্যোগ শুরু হয়। রানির দ্বিতীয় ছেলে ডিউক অব ইয়র্ক ও স্ত্রী সারা আলাদা হয়ে যান। মেয়ে প্রিন্সেস অ্যান ও স্বামী মার্ক ফিলিপস্-এর বিয়ে ভেঙে যায়। প্রিন্স ও প্রিন্সেস অফ ওয়েলস্, অর্থাৎ চালর্স ও ডায়ানা বিয়েতে যে গভীর অসুখী এ খবর জানাজানি হয়। শেষ পর্যন্ত তারাও আলাদা হয়ে যান। ১৯৯২ সালের ২০ নভেম্বর রানির প্রিয় বাসভবন উইন্ডসর ক্যাসেলে ওই বছরই বিরাট অগ্নিকাণ্ড হয়। ওই ভবন মেরামতের খরচ সাধারণ মানুষ জোগাবে নাকি তা রানির তহবিল থেকে ব্যয় করা উচিত তা নিয়ে চলে তুমুল বিতর্ক। রানি ১৯৯২ সালকে ব্যাখ্যা করেন ‘অ্যানাস হরিবিলিস্’ অর্থাৎ দুর্যোগের বছর হিসেবে।
একদিকে ইউরোপের সঙ্গে নতুন জোট গঠনের মধ্যে দিয়ে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের যোগাযোগ কিছুটা শিথিল হয়ে আসা, অন্যদিকে ব্রিটেনে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে অব্যাহত বিতর্ক! এর মধ্যেও যখন রানি রাজপরিবারের উজ্জ্বল স্তম্ভ হিসাবে তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট, তখন প্রিন্সেস ডায়ানার আকস্মিক মৃত্যু ব্রিটেনের রাজপরিবারের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে আসে। ১৯৯৭ সালের অগাস্টে প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় ডায়ানা মারা যাবার পর রানির বিরুদ্ধে ওঠে সমালোচনার ঝড়। যখন প্রাসাদের বাইরে বিপুল সংখ্যক মানুষের ঢল- ফুলের শ্রদ্ধার্ঘ্যে ভরে উঠেছে প্রাসাদের ফটকের বাইরের রাস্তাঘাট, তখন সেই শোকের মুহূর্তের সঙ্গে রানির আপাতদৃষ্টিতে একাত্ম হতে না পারায় মানুষ সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে।
মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত রানিকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে হয়। ভাষণে তিনি পুত্রবধূ ডায়ানার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজপরিবারকে বদলানোর অঙ্গীকার করেন।
সুবর্ণ জয়ন্তী ও অনুষ্ঠানাদি পালন
রাজপরিবারের প্রতি ব্রিটেনের মানুষের আগ্রহ, উদ্দীপনা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ২০০২ সালে মহাসমারোহে উদযাপিত হয় রানির সিংহাসন আরোহণের সুবর্ণ জয়ন্তী। এরপর রানির ৮০ বছরের জন্মদিনে উইন্ডসরের রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার বিশেষ সাক্ষাত-সফর, রানি ও প্রিন্স ফিলিপের বিয়ের ৬০তম বার্ষিকী উৎসব এবং ২০১১ সালে রানির নাতি উইলিয়াম ও ক্যাথরিনের বিয়ে, ২০১২ সালে রানির সিংহাসন আরোহণের হীরক জয়ন্তী। সবশেষ ২০২২-এর জুনে মহাসমারোহে উদযাপিত হয়েছে রানির সিংহাসন আরোহণের ৭০তম বার্ষিকী বা প্লাটিনাম জয়ন্তী।
এসব উদযাপন উপলক্ষে জনতার উচ্ছ্বাস ও অংশগ্রহণ রাজপরিবারকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল যে ব্রিটেনের বহু মানুষ এখনও রাজপরিবার নিয়ে আগ্রহী। রাজপরিবারের প্রতি জনগোষ্ঠীর অন্তত একাংশের আনুগত্য লোপ পায়নি।
২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ব্রিটিশ রাজসিংহাসনে আসীন থাকার গৌরব অর্জন করেন। তার বাবার প্রপিতামহী রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালের মেয়াদও ছিল এর চেয়ে কম। রানির দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী প্রিন্স ফিলিপ প্রয়াত হন ২০২১-এর এপ্রিল মাসে। রানির রাজত্বকালের শুরুর সময় ব্রিটিশ রাজতন্ত্র যে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যে রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের তখন প্রবল আনুগত্য ছিল, তার রাজত্বকালের শেষ সময়ে সেই উচ্ছ্বাস ও আনুগত্যে কিছুটা ভাটা পড়েছিল বটে, কিন্তু ব্রিটিশ জনগণের হৃদয়ে রাজপরিবারের প্রতি ভালোবাসা যাতে চিরস্থায়ী হয়, তা নিশ্চিত করতে সারা জীবন সচেষ্ট ছিলেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে আরোহনের সাত দশকে ১৫ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আসা যাওয়া দেখেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন উইনস্টন চার্চিল, মার্গারেট থ্যাচার, বরিস জনসনসহ সবশেষ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া লিজ ট্রাস।
১৯৫২ সালে রানি যখন সিংহাসনে বসেন, তখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা উইনস্টন চার্চিল। ৫২ সালে বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় এলিজাবেথ। বয়সে ছোট হওয়ায় সেসময় এলিজাবেথকে শিশু বলে অভিহিত করেছিলেন তিনি। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন চার্চিল।
১৯৫৫-৫৭ সাল পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকেন অ্যান্থনি ইডেন। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ ইস্যুতে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হ্যারল্ড ম্যাকমিলান। ১৯৭০-এ উইলসনের স্থলাভিষিক্ত হন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা এডওয়ার্ড হিথ। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৪ পর্যন্ত। রানি এলিজাবেথের সময় হ্যারল্ড উইলসন দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪-৭০ এবং ১৯৭৪ থেকে ৭৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। রানির শাসনামলে তিনি ছিলেন প্রথম লেবার পার্টির কোনও প্রধানমন্ত্রী। জেমস ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদে ছিলেন। তার সরকারের সময় ব্রিটেনের অর্থনৈতিক মন্দা এবং ইউনিয়নগুলোতে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়। উল্লেখ্য রানি এলিজাবেথের সময়ে ১১ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার। তিনি ১৯৭৯-১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মার্গারেট থ্যাচার এবং রানি এলিজাবেথ। ১৯৯০ সালে এ পদে বসেন জন মেজর। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা মেজর ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সরকার প্রধান ছিলেন। সবথেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে টনি ব্লেয়ার হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি রানির শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। টনি ব্লেয়ারের স্থলাভিষিক্ত হন গর্ডন ব্রাউন। লেবার পার্টির নেতা ২০০৭-২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সরকারপ্রধান ছিলেন। এরপর কনজারভেটিভ পার্টির ডেভিড ক্যামেরুন ক্ষমতায় ছিলেন ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার প্রধানের দায়িত্বে বসেন থেরেসা মে। তিনি ব্রিটেনের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট থেকে সরে দাঁড়াতে হয় তাকে। এরপর আসেন সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। যিনি ২০১৯-২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার আমলেই ব্রেক্সিট ইস্যুটি সমাধান হয়। গত জুলাইয়ে তাকেও পদত্যাগ করতে হয়। সবশেষ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বসেন লিজ ট্রাস। ৬ সেপ্টেম্বর বালমোরালে রানি এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করার পর সরকার গঠনের অনুমতি পান তিনি। এর দু’দিন পরই মারা গেলেন রানি এলিজাবেথ। তাঁর জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সিংহাসনের দায়িত্বে থাকা রানির অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।








