স্টাফ রিপোর্টার – প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট আজ সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। ১২ টার দিকে প্রধানমন্ত্রী নয়া দিল্লি পৌছান। নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর বিমান অবতরণ করে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের রেল ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ ইমরান স্বাগত জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সফরকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং উপ-রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। করোনা মহামারির আগে ২০১৯ সালে তাঁর সর্বশেষ ভারত সফরের পর চার দিনের এ সফরে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। বিশেষ করে ৭টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। ১৭০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের দ্বিতীয় দিন আগামীকাল মঙ্গলবার ৬ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং একান্ত বৈঠক করার কথা রয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এ বিষয়ে পরে একটি প্রেস বিবৃতি জারি করা হবে।
হায়দরাবাদ হাউসে পৌঁছালে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবেন নরেন্দ্র মোদি। সেখানে শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার পরিদর্শন করবেন। শেখ হাসিনা পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তাঁর সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন।
৫ সেপ্টেম্বর রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কথা রয়েছে তাঁর। ৬ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখাড়ের সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একই দিনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর দেখা করার কথা রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের উন্নয়ন মন্ত্রী জি কিষান রেড্ডি এবং নোবেল বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী ৭ সেপ্টেম্বর তার সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎ করবেন। আদানি গ্রুপ চেয়ারম্যান গৌতম আদানিও ৫ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ বা গুরুতর আহত ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বংশধরদের ‘মুজিব বৃত্তি’ প্রদানের একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফেরার আগে রাজস্থানের খাজা গরীব নওয়াজ দরগাহ শরীফ, আজমির (আজমির শরীফ দরগাহ) এবং ৫ সেপ্টেম্বর ভারত সফরের প্রথম দিনে দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া দরগাহ পরিদর্শন করবেন।
বৈঠক শেষে বেশ কয়েকটি চুক্তি-সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব চুক্তি-সমঝোতা স্মারক পানি ব্যবস্থাপনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, রেলওয়ে, আইন, তথ্য ও সম্প্রচার, প্রভৃতি ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্পর্কিত। অনুষ্ঠান শেষে দু’দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করবেন। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ বা বৈঠক করবেন।
এবারের সফরে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব ভারতীয় সেনাসদস্য শহীদ হয়েছেন বা আহত হয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্টুডেন্ট স্কলারশিপ” প্রদান করা হবে। উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর এ দুইটি পর্যায়ে স্কলারশিপ প্রদান করা হবে। প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকে শহীদ ও আহত ভারতীয় সেনাসদস্যদের পরিবারের মাঝে এ স্কলারশিপ নিজ হাতে তুলে দেবেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সেনাসদস্যদের মহান আত্মত্যাগকে যথাযথ সম্মানের সাথে স্মরণ করা হবে।
আগামী ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি বিজনেস ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ভারত সফর করবে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারত ও বাংলাদেশের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ এই ইভেন্টে উপস্থিত থাকবেন। বিজনেস ইভেন্টের মাধ্যমে যেমন বাংলাদেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের চিত্র ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে তুলে ধরা যাবে, তেমনি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সুসম্পর্ক বর্তমানে বিশেষ উচ্চতায় অবস্থান করছে। বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে স্থলসীমানা ও সমুদ্রসীমানা নির্ধারণ সারাবিশ্বের সামনে সহযোগিতার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় যেমন নিরাপত্তা ইস্যু, আন্তঃসংযোগ, বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জনযোগাযোগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক, আন্তঃদেশীয় বাস চলাচল, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে সর্বশেষ ভারত সফর করেন। পরবর্তীতে কোভিড মহামারির ফলে বিগত ২০২০ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এক ভার্চুয়াল সামিটে অংশগ্রহণ করেন। ২০২১ সালের মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং ডিসেম্বর মাসে ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ১০০তম জন্মবার্ষিকী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণ জয়ন্তী এবং ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনিষ্পন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অর্জন করা যাবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক গভীরতর হওয়াসহ সার্বিকভাবে এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে নতুন নতুন উদ্যোগ গৃহীত হবে। এই সফর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ও বিদ্যমান গতিশীল সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের সফরে আগামী ২৫ বছরে ইন্দো-বাংলা সম্পর্কের রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে। দীর্ঘ তিন বছরের বিরতিতে এবারের সফরে কী কী হতে পারে, কোন্ ইস্যুতে কতটুকু আলাপচারিতা হতে পারে, সেসব থেকে কতটুকু ফল মিলবে, তা নিয়েই এখন আলোচনা ঢাকা থেকে দিল্লি সর্বত্র।
দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদির মধ্যেও নিরাপত্তা ইস্যু, সীমান্তে মিয়ানমারের উসকানিমূলক যুদ্ধবিমানের প্যাট্রলিং যখন চলমান, তখন এই বিষয়গুলোই শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে প্রাধান্য পেতে পারে বলে মনে করছেন ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। নিরাপত্তা গবেষক ও বিশ্লেষক স্মৃতি এস পট্টনায়েকের মতে, রোহিঙ্গারা পুরো অঞ্চলের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ভারত স্পষ্টভাবে পক্ষ নেবে না। তিনি বলেন, সমাধান না করলে রোহিঙ্গারা স্থানীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সন্ত্রাসে জড়াতে পারে।
এদিকে, অল ইন্ডিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গৌতম লাহিড়ী মনে করেন, এবারের সফরে আগামী দুই যুগের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্থায়ী রূপরেখা চূড়ান্ত করতে পারেন হাসিনা-মোদির নেতৃত্ব। তাদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধু তিস্তায় আটকে না থেকে, বহুমাত্রিক ইস্যুতে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও দৃঢ় ও নবায়নের দিকে জোর দিতে পারেন দুদেশের শীর্ষ নেতারা।








