মিথুন আশরাফ – জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সুবর্ণজয়ন্তী তথা ৫০ বছর পূর্তির মহাসমাবেশ মহাসমুদ্রে পরিণত করে সন্ত্রাসী এবং রাজাকার আলবদর তথা পাকি-দাদলালদের সতর্ক করে দেয়া হল বাংলাদেশ বিরোধী কোন কর্মকান্ড বরদাস্ত করা হবে না।
শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে সাথে নিয়ে বেলুন উড়িয়ে সুবর্ণ জয়ন্তীর মহাসমাবেশ উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই জনসমুদ্রের অভিজ্ঞতা যুব সমাজের সংগ্রামী চেতনা আরো বেগবান করবে।
তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এ দেশের যুবদের বুকে অদম্য শক্তির যে বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত করে গেছেন, যে প্রেরণা তিনি যুগিয়ে গিয়েছেন, সেই প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে যুবলীগ এদেশের যুবসমাজকে সঙ্গে নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, এ প্রত্যাশা করি।
আওয়ামী লীগ সভাপতি দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে সমাবেশস্থলে পৌঁছানোর পর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এর সঙ্গে সুর মেলান তিনিসহ সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীরা। সমাবেশে উপস্থিত থাকেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান আমির হোসেন আমু, নুরুল মজিদ হুমায়ুন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজমসহ ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। মঞ্চে থাকেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের জ্যেষ্ঠ নেতারা। এর আগে সকাল থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে মিছিল নিয়ে আসতে থাকেন রাজধানীসহ সারা দেশের যুবলীগ নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের এই মহাসমাবেশ সাম্প্রতিক সময়ের আর সব সমাবেশকে ম্লান করে দিয়েছে।
সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে এ সমাবেশের আয়োজন করা হলেও এর মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী দলগুলোকেও একটা সতর্কবার্তা দেয় যুবলীগ। এ জন্য সমাবেশে উপস্থিতির বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের সব নেতা-কর্মীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ শেখ ফজলুল হক মণিসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ সব যুবলীগ নেতা-কর্মীকে স্মরণ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার বলিষ্ঠ, গতিশীল, সাহসী, ও ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি নিজস্ব জাতি রাষ্ট্র ও গর্বিত আত্মপরিচয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে যুবশক্তির উন্মেষ ঘটেছিল, সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বদেশ পুনর্গঠনে সেই যুবশক্তিকে সম্পৃক্ত করার অভীষ্ট লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সৃষ্টি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি’র নেতৃত্বে এই সংগঠনের জন্ম। জন্মলগ্ন থেকেই যুবলীগ আত্মনিয়োগ করে দেশ গঠনে।
তিনি আরও বলেন, জাতির পিতার নেতৃত্বে জাতি যখন শোষণহীন-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে নিয়োজিত, তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। হত্যা করা হয় যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণিকে। শুরু হয় হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাহসী প্রতিবাদ জানায়। চট্টগ্রামের যুবলীগ নেতা মৌলভী সৈয়দ আহমদ ও বগুড়ার আবদুল খালেক খসরুসহ অনেক যুবলীগ নেতা-কর্মী সেসময় জীবন দিয়েছেন। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে যুবলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘৭৫ পরবর্তী যুবলীগ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্যানগার্ডে পরিণত হয়।
স্বাধীকার আন্দোলন তথা জনগণের ভোটে ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জীবন দিয়েছেন যুবলীগ নেতা নূর হোসেন, নুরুল হুদা বাবুল, ফাত্তাহসহ অনেকে। তাদের মহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি যুবলীগের সব শহীদের আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘ ২১ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে আমরা যুব সমাজকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করি। যুবরা আবারো উন্নয়নের সুফল পেতে শুরু করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয় লাভের পর হতে আওয়ামী লীগ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত প্রায় ১৪ বছরে আমরা দেশের প্রতিটি খাতে কাঙ্খিত অগ্রগতি অর্জন করেছি। আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই যুবশক্তি। যুব সমাজের আছে অমিত সম্ভাবনা ও সতেজ উদ্যম। যুবশক্তিই পারে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়তে। বৈশ্বিক করোনা মহামারির সময়ে আমাদের যুবলীগের নেতা-কর্মীরা অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করে, উদ্বাস্তু মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ করে, কৃষকের ধান কেটে এবং ফ্রি মেডিকেল সেবা দিয়ে মানবিকতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুবলীগের উদ্দেশে দিকনির্দেশনা মূলক বক্তব্য দেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, যুবলীগ উন্নত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। যুবকরাই দেশের শক্তি। যুবকদের দেশ গড়ার কাজে মনোযোগী হতে হবে।
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি, আর্থিক ও খাদ্য সংকটের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের পরনির্ভনশীল থাকলে হবে না। আত্মনির্ভশীল হতে হবে। করোনার সময় যুবলীগসহ সব সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা কৃষকদের ধান কেটে দিয়েছে উল্লেখ করে যুবলীগকর্মীদের তিনি সারাদেশে বিনাচাষে পড়ে থাকা জমিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানান। পাশাপাশি সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকের সঙ্গে যুবকরা যেন জড়াতে না পারে সেজন্য যুবলীগকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যে বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দলের মুখে আওয়ামী লীগের সমালোচনা শোভা পায় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের এই দিনে যাত্রা শুরু হয় যুবলীগের। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সংগঠনটি আজ পা রেখেছে ৫০ বছরে। ফজলুল হক মনি ছিলেন যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের যেসব উন্নয়ন হয়েছে সেগুলো বিএনপি অস্বীকার করলেও তারা এর সুবিধা ঠিকই নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। তারা এর সুবিধা নিয়ে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করছেন। তিনি বলেন, যুবক থাকলে অনেক সুবিধা। যুবকরা অনেক কাজ করতে পারেন। জাতির পিতা সে কারণেই যুবলীগ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতেই জাতির পিতা ও তার নেতাদের হত্যা করা হয়েছিল। যার মাধ্যমে দেশকে অনেক পিছিয়ে দেয়া হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা।
বিএনপির উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, তারা শুধু সুফল ভোগ করবে। আওয়ামী লীগ দেশে সবার হাতে ফোন তুলে দিয়েছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছে। আর তারা সেগুলোর সুফল নেয় আর আমাদেরও সমালোচনা করেন।
দেশে ৮ হাজারে বেশি ডিজিটাল সেন্টার করার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ৮ হাজারের বেশি সেসব ডিজিটাল সেন্টারে খুব সহজেই মানুষ সেবা পাচ্ছে, তরুণদের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সমালোচনা করে সরকারপ্রধান বলেন, জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া, সবই তো একই ইতিহাস। জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেই যুবলীগের অনেক নেতাকে হত্যা করেছে। যাদের লাশও পাওয়া যায়নি। সেনাবাহিনীর মতো করে, সেনাবাহিনীর যেমন অনেক কর্মকর্তার লাশ পাওয়া যায়নি। গুম করেছে, ঠিক তেমনই। আবার তারা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে সেগুলো নিয়ে অভিযোগ করাও বন্ধ করে দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়াও ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। অনেকের লাশও পাওয়া যায়নি। তিনিও তো ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দিয়ে অপারেশন ক্লিনহার্ট থেকে সংশ্লিষ্টদের অব্যাহতি দিয়েছেন।








