,

যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত – মির্জা ফখরুল

এবার বিভাগীয় গণসমাবেশের ঘোষণা বিএনপির

স্টাফ রিপোর্টার – বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। বলেন, নির্বাচনের পর আন্দোলনরত দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে বিএনপি। দেশে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য নিরপেক্ষে সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আন্দোলনের জন্য সকল রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে কী হবে সেটা নির্ধারিত হবে। তিনি বলেন, আমরা পরিষ্কার করে বলেছি যেকোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা সংগঠন যারা এই কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন করবে তাদের সকলের সাথে আমরা যুগোপৎ আন্দোলন করব।

মির্জা ফখরুল বলেন, অত্যাচার নির্যাতন করে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কোনো সরকারই বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিবাদী সরকার বেশি দিন টিকে থাকে গুম, খুন, নির্যাতন, গ্রেফতার ও দমন নীতির মধ্য দিয়ে। ভোলায় আব্দুর রহিম ও নুরে আলমকে হত্যার পরও মানুষ বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, হামলা করছে ক্ষমতাসীনরা। অথচ মামলা দিচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে। পুলিশ বিএনপির প্রতিপক্ষ নয়। কিন্তু সরকার পুলিশকে ব্যবহার করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। আন্দোলন ও নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পার্টির সঙ্গে বিশেষ কোনো আলোচনা করা হয়নি বলেও জানিয়েছেন বিএনপির এ নেতা।

২০ দলীয় জোট ভেঙে দেওয়া হয়েছে কিনা ও জামায়াতের সঙ্গে জোট আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা সব দলকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করবো। সব দলের জন্য দরজা খোলা আছে। মির্জা ফখরুল আরও বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির সভায় জ্বালানি সরবরাহের ব্যর্থতায় ডিজেলচালিত কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকলেও কুইক রেন্টালে চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়াতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত ২০টি জেনেরিকের (মূল ওষুধ) ৫০টি ব্যান্ডের ওষুধের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। সভা মনে করে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য যখন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে সেই সময় গুটিকতক ব্যবসায়ীকে মুনাফা পাইয়ে দেওয়ার জন্য অনৈতিকভাবে ওষুধের মূল্য বাড়ানো করছে। এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়।

তিনি বলেন, সভায় গত ২২ আগস্ট থেকে লোডশেডিং জ্বালানি তেল, চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য বাড়ার প্রতিবাদে আন্দোলনে ভোলায় স্বেচ্ছাসেবক দলের আব্দুর রহিম, ছাত্রদলের নূর আলম, নারায়ণগঞ্জের যুবদল নেতা শাওন হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশব্যাপী আন্দোলনে অসংখ্য নেতাকর্মীদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ও পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, সহিংসতা বন্ধ করার জন্য একটি মাত্র পথ, সেটা হলো নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আবার চালু করা। তিনি বলেন, এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। একটি সুষ্ঠু অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারের পদত্যাগের বিকল্প নেই। এই সংসদ বাতিল করতে হবে এবং একটি নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তাদের অধীনে আরেকটি নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। সকল দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মানুষ ভোট দিতে পারে।

মির্জা ফখরুল বলেন, পুলিশ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান। তার মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। নাশকতা বন্ধ করা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে পুলিশের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জাতীয় পার্টির সঙ্গে আমাদের এখনও ফরমাল (আনুষ্ঠানিক) কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা যুগপথ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছি, আন্দোলনের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে কী হবে, তা নির্ধারিত হবে। আলোচনার দরজা খোলা আছে, রাজনৈতিক দল ব্যক্তি, সংগঠন, যারাই এই কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে, তাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়েই আমরা যুগপৎ আন্দোলন করব।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের মূলকথা অনেক আগেই বলেছি যে, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। এই সংসদ বাতিল করতে হবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, যাদের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন হবে, তারা সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোটের পরিবেশ তৈরি করবে যাতে ভোটাররা ভোট দিতে পারে দিনে। তার সঙ্গে আমাদের নেতা বলেছেন, আমরা নির্বাচনের পরে আন্দোলনকারী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করব। প্রধান কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে সেগুলোকে এককভাবে গড়ে তোলাটা সমুচিত হবে না তাই অন্যান্য দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই।
এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, পুলিশের ভূমিকা নির্ভর করবে সরকারের ভূমিকার উপরে। সরকার যে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ করতে হয়। বারবার বলার চেষ্টা করেছি যে, পুলিশ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান, তার মৌলিক দায়িত্বগুলো হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা নাশকতা বন্ধ করা। কিন্তু বাংলাদেশের তাদের দায়িত্ব একটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে, নির্দেশ আসে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা গায়েবি মামলা দেওয়া।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে আওয়ামী লীগ, হামলা করছে আওয়ামী লীগ, আর সেখানে পুলিশ বাদী হয়ে উল্টো বিএনপির নেতাকর্মীর নামে মামলা দিচ্ছে। সরকার যদি চায়, এখানে একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন করবে, তাহলেই এটা হতে পারে। আমাদের দাবি একটাই, বলছি পরিবেশ তৈরি করো, একটি নিরপেক্ষ অবস্থা তৈরি করো, ভোটাররা যাতে তাদের ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে বেছে নিতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার অবৈধভাবে টিকে থাকার জন্য সংবিধান লঙ্ঘন করে, মানবাধিকার লঙ্ঘনে যখন পুলিশকে ব্যবহার করে, তখন নিঃসন্দেহে সেই বিষয়গুলো জনগণের সামনে এসে দাঁড়ায়। আজকে আমেরিকা যে কারণে স্যাংশন দিয়েছে সেই র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগটা হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আমি অবশ্যই একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে আমার দায়িত্ব এবং কর্তব্য যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া যে, আপনারা সরকারের অবৈধ নির্দেশে, বেআইনি নির্দেশে এমন কেনো কাজ করবেন না যাতে আপনাদের ওপরেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আসে। আপনারা ভালো করে লক্ষ্য করে দেখবেন, সব জায়গায় এই ঘটনাগুলো ঘটছে না বা সব পুলিশই এই ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে না। কয়েকটা জায়গায় অতি উৎসাহী কিছু অফিসার এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমি যেটা জানতে চেয়েছিলাম, নারায়নগঞ্জে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি হলো সেটা কিভাবে হলো, কোন কর্তৃত্ব থেকে সে (গোয়েন্দা পুলিশ) এটা ব্যবহার করতে পারলো। সেই উত্তর কিন্তু এখনো বাংলাদেশের মানুষ পায়নি।

সোমবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত মানবাধিকার কমিশনের সম্মেলনে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি বড় করে উঠে এসেছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্যে তারা এখানে একটা নিরপেক্ষ স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সহায়তা করতে সরকারকে বলেছে, আমাদেরকে সুযোগ দাও, আমরা এটা করতে চাই। অর্থাৎ এখানে যে মানবাধিকার লঙ্ঘেন হচ্ছে তা যেন বন্ধ করা যায়।
এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত পরিষ্কার করে তারা বলেছে, মানুষের কথা বলার যে অধিকার, তার মত প্রকাশের যে অধিকার তাকেও এখানে আপহোল্ড করতে হবে। একই সঙ্গে বলেছে, নির্বাচনের পূর্বে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে যেন শুধু তার মতের জন্য হয়রানি না করা হয়।

স্থায়ী কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যরিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ