স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে গত ৪ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭২ সালের এই দিনে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এ উপলক্ষে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে একটি অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের সংসদের স্পিকার লিন্ডসে হোয়েল। লন্ডনে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট ভবন ওয়েস্টমিনিস্টারে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে এক বৈঠকে এই প্রস্তাব দেন লিন্ডসে।
লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য এবং কপ২৬ এ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান ব্রিটিশ স্পিকার। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। এর উত্তরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ব্রিটিশ সংসদকে রোহিঙ্গা বিষয়ে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সংসদ ফ্রেন্ডশিপ গঠনেরও প্রস্তাব করেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। জলবায়ু পরিবর্তন ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ওয়েস্টমিনিস্টারকে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত (সিপিএ) পার্লামেন্টগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানান স্পিকার। স্পিকার ড. শিরীন শারমিনের আগমন উপলক্ষে লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার ভবন প্রাঙ্গনে ব্রিটিশ পতাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের পতাকাও উত্তোলন করা হয়।
সাক্ষাৎকালে শিরীন শারমি ও লিন্ডসে হোয়েল জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, রোহিঙ্গা ইস্যু, বাংলাদেশের ডায়াসপোরা এবং সামাজিক উন্নয়নসহ কমনওয়েলথভুক্ত পার্লামেন্টগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। স্পিকার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলা, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়নসহ সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ওয়েস্টমিনিস্টার ও কমনওয়েলথভুক্ত পার্লামেন্টগুলো একত্রে কাজ করতে পারে। বিগত সময়ে সিপিএ-এর চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কমনওয়েলথভুক্ত পার্লামেন্টগুলো এবং আইপিইউ-সহ অন্যান্য পার্লামেন্টারি সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তিনি অবদান রেখেছেন বলে উল্লেখ করেন। এসব ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সহযোগিতা ও সমর্থন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন স্পিকার।
তিনি বলেন, কমনওয়েলথ দেশসমূহের কনফারেন্স কমনওয়েলথ হেডস অব গভর্নমেন্ট মিটিং (CHOGM)-এ সরকারি পর্যায়ে আলোচনার পাশাপাশি পার্লামেন্টসমূহের সাথে বিদ্যমান ও উদীয়মান ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় করা যেতে পারে। বর্তমানে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা পার্লামেন্টগুলোর সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে মতবিনিময় করে যাচ্ছে। কমনওয়েলথও এই পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারে।
স্পিকার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে যেসব দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বাংলাদেশ অন্যতম। তবে সরকারের যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের কারণে বাংলাদেশ সফলতার সাথে সংকট মোকাবেলা করছে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পাশাপাশি বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী পার্সপেক্টিভ প্লান ও ডেল্টা প্লান গ্রহণ করেছে। এসব ক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়টি তুলে ধরেন।
ব্রিটিশ স্পিকার স্যার লিন্ডসে হোয়েল জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপ ও উদ্যোগসমূহের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের ডায়াসপোরা ব্রিটেনে বেশ প্রশংসার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টসহ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা নিষ্ঠার সাথে ব্রিটেনের উন্নয়নে অবদান রেখে যাচ্ছেন। একইসাথে তারা বাংলাদেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ব্রিটেনের অব্যাহত সমর্থন কামনা করেন। বাংলাদেশ পার্লামেন্টের ৫০ বছর পূর্তিতে সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে তিনি ব্রিটিশ স্পিকারকে আমন্ত্রণ জানান। স্পিকার স্যার লিন্ডসে হোয়েল এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎকালে ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাইদা মুনা তাসনিম ও যুগ্মসচিব এম এ কামাল বিল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতি ও মূল্যবোধ জোরালো করার ক্ষেত্রে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সংসদ সদস্যদের এ লক্ষ্যে জনগণের মাঝে কাজ করে যেতে হবে। যুক্তরাজ্যের লর্ড সভার কমিশনার ফর স্ট্যান্ডার্ডস ও কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আকবর খান পার্ক প্লাজা ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ হোটেলের লাউঞ্জে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সঙ্গে সাক্ষাৎকালে স্পিকার এসব কথা বলেন।
স্পিকার বলেন, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, লিঙ্গ বৈষম্য, বেকারত্ব ও স্বাস্থ্য সমস্যা নিরসন করতে না পারলে গণতন্ত্র যথাযথভাবে অর্থবহ হয় না। তাই সরকারের পাশাপাশি সংসদ সদস্যদেরও এসব সমস্যা নিরসনে কাজ করে যেতে হবে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নানামুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণের কারণে জনগণের গড় আয় ও আয়ু বৃদ্ধি সর্বোপরি জীবনমানের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রম উল্লেখপূর্বক স্পিকার বলেন, সংসদ সদস্যদের মাঝে জ্ঞানভিত্তিক সংসদীয় চর্চা জোরালো করার জন্য জাতীয় সংসদ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সংসদ সদস্যরা জনগণের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে এবং সেইসঙ্গে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পার্লামেন্টারিয়ান্স অন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিএপিপিডি) সংসদ সদস্যদের মাঝে জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক সচেতনতা জোরালোকরণে কাজ করছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বাজেট সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত ও প্রতিবেদন সরবরাহ করার জন্য পাবলিক ফিন্যান্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম, বাজেট এনালাইসিস ও মনিটরিং ইউনিট এবং জাতীয় সংসদের লাইব্রেরি ও গবেষণা শাখা কাজ করছে।
তিনি বলেন, সিপিএ-এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ ও সেমিনার আয়োজন করা হচ্ছে। বিগত সময়ে সিপিএ চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালনকালীন তিনি এ সব উদ্যোগকে আরও জোরালো করেছিলেন। শিরীন শারমিন চৌধুরী সিপিএ চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালনকালীন যে দক্ষতা, মনোযোগ ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, তা আকবর খান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। আকবর খান বলেন, ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের পরিবর্তন হয়েছে।
ব্রেক্সিট কার্যকরে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইনগত বিষয়গুলো অব্যাহতভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর পার্লামেন্টসমূহও ব্রেক্সিট পরবর্তী উন্নতি পর্যবেক্ষণে রাখতে পারে।
স্পিকার বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ অবগত রয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট উভয়ের সঙ্গেই বাংলাদেশ পার্লামেন্টের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ড. শিরীন শারমিন বলেন, বাংলাদেশকে প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, জলবায়ু স্থিতিস্থাপক ডেল্টা এবং আঞ্চলিক জ্ঞান ও সংযোগের হাবে রূপান্তরে বাংলাদেশ সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টায় যুক্তরাজ্য নির্ভরযোগ্য বন্ধু ও অংশীদার।








