একাদশ জাতীয় স্কাউট জাম্বুরির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
স্টাফ রিপোর্টার – প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংঘাত, খুনোখুনি, অগ্নিসন্ত্রাস, দুর্নীতি, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পালা, নির্বাচন নিয়ে খেলা ইত্যাদিকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বুধবার গাজীপুরের মৌচাকে জাতীয় স্কাউট প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ৩২তম এশিয়া প্যাসিফিক ও একাদশ জাতীয় স্কাউট জাম্বুরির সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আজকের যে বাংলাদেশ আমরা দেখছি, তা কিন্তু আগে এমনটা ছিল না। বাংলাদেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করতে হয়েছে। ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসি, তারপর থেকেই দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি চাই, দেশ আরও উন্নতি করুক।
প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্কাউট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, তাহলেই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার উপযুক্ত নাগরিক তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব আর সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমি চাই, আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থী, শুধু বাছা বাছা কয়েকজন না-প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে যে পর্যন্ত স্কাউট করা যায়; এখন যদিও আমাদের ২২ লাখ সদস্য আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ লাখ স্কাউট করা হবে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন স্কাউট প্রশিক্ষণ পায়। তাহলে আমি বিশ্বাস করি, আমার দেশ সোনার বাংলা গড়ার বা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার উপযুক্ত নাগরিক তৈরি হবে। আমি আশা করি, বাংলাদেশে একদিন বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরি অনুষ্ঠিত করতে পারবো। সেভাবে আমাদের এখন থেকে উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের বাংলাদেশ দেখে আমাদের যে ধারণা, এক সময় বাংলাদেশ কিন্তু এটা ছিল না। ক্ষুধা, দারিদ্র্যতা নিত্য সঙ্গী ছিল। আমাদের প্রচেষ্টা হচ্ছে, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আজকের বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ।
প্রতিটি ক্ষেত্রে স্মার্ট জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজকে যতদূর এগিয়েছে, ভবিষ্যতে আমাদের আজকের শিশু-কিশোর-তরুণ বাংলাদেশকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার ভরসা আছে, তোমরা তা পারবে। কারণ আমি দেখেছি, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে যেভাবে তোমরা মানুষের পাশে দাঁড়াও; মানবতার সেবাই তো বড় সেবা। মানুষের জন্য কাজ করতে পারলে সব থেকে আত্মতুষ্টি পাওয়া যায়। আমি সেটাই চাই, তোমরা সেভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হও। মনে রাখবে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আমাদের লাল-সবুজ পতাকা লাখো মানুষের রক্তের চিহ্ন বয়ে বেড়ায়। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে আমাদের এই স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা যেন ব্যর্থ হতে না পারে। স্বাধীনতার সুফল মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।
শেখ রাসেলকে স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ছোট্ট সোনামণিরা, যখনই আমি তোমাদের মাঝে আসি তখনই আমার মনে পড়ে আমার ছোট্ট শিশু ভাইটি মাত্র ১০ বছরে ঘাতকের নির্মম বুলেট যাকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। তোমাদের মাঝে আমি খুঁজে ফিরি আমার ছোট্ট ১০ বছরের ভাই রাসেলকে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্কাউটদের মধ্যেই সুপ্ত আছে আমাদের দেশের ভবিষ্যত, রাজনৈতিক নেতা, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী, কবি-সাহিত্যিক, প্রশাসক শিক্ষক, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, যারা দেশের সেবা করছে। তোমাদের মাঝ থেকেই সকলে উঠে আসবে। তোমরাই পারবে আগামীতে দেশকে এগিয়ে নিতে। তোমাদের মাঝ থেকেই তো সেই নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের রোভার স্কাউটদের জন্য অ্যাডভেঞ্চার ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণের লক্ষ্যে ১৮৮ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছি। বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে স্কাউট ভবন ও প্রশিক্ষণ নির্মাণের লক্ষ্যে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২১৭ জেলা ও উপজেলায় স্কাউট ভবন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আমরা নির্মাণ করে দেবো। আমাদের লক্ষ্য দেশে স্কাউটিং সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিশু-কিশোর যুবদের আত্মনির্ভরশীল ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুটি করে কাপ স্কাউট, রোভার স্কাউট ও স্কাউট দল খোলার নির্দেশনা দিয়েছি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পাশাপাশি মাদ্রাসাগুলোতে যেন রোভার স্কাউট দল গঠন করা হয় সে বিষয়েও আমাদের কাজ করতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি জানি যে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ স্কাউট দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। আমাদের স্কাউট সদস্যরা ব্যতিক্রমধর্মী কার্যক্রম পরিচালনা গ্রহণ করে থাকে। যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ২৪তম এশিয়া প্যাসিফিক রেজিওনাল স্কাউট কনফারেন্সসহ স্কাউট ফ্রেন্ডশিপ ক্যাম্প সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
স্কুলের পাশাপাশি মাদরাসাতেও স্কাউটিং চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীই যেন স্কাউট প্রশিক্ষণ পায় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, স্কুলের পাশাপাশি মাদারাসা শিক্ষার্থীদেরও স্কাউট আন্দোলনে অংশ নিতে হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে তরুণদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতা যেনো অক্ষুন্ন থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও জানান তিনি। স্কাউটদের দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার সুফল প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। স্কাউট আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
২০৪১ সাল নাগাদ সরকার দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত করতে চায় জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দেশ গড়তে সংঘাত, ক্ষমতা দখল ও আগুন সন্ত্রাসকে পেছনে ফেলে ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাকে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্কাউটদের সর্বোচ্চ পদক শাপলাকাব অ্যাওয়ার্ড দেন প্রধানমন্ত্রী।
মৌচাক জাতীয় স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় ৩২তম এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল ও একাদশ জাতীয় স্কাউট জাম্বুরি ২০২৩। সারাদেশের ৯১৬টি স্কাউট ইউনিটের প্রায় ৮ সহস্রাধিক স্কাউট, কর্মকর্তা, আইএসটি রোভার স্বেচ্ছাসেবক, ইউনিট লিডার এবং বিভিন্ন দেশ হতে আগত স্কাউটারসহ ১০ হাজার ৯৯৬ জন এই জাম্বুরিতে অংশগ্রহণ করেছে।








