,

স্মার্ট বাংলাদেশের নতুন সংযোজন মেট্রোরেল – প্রধানমন্ত্রী

স্মার্ট বাংলাদেশের নতুন সংযোজন মেট্রোরেল - প্রধানমন্ত্রী

মিথুন আশরাফ – স্বপ্নের মেট্রোরেলের উদ্বোধন করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটল। এই মেট্রোরেল স্মার্ট বাংলাদেশের নতুন সংযোজন হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুত গতির রেলযুগে প্রবেশ করলো। ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলবে মেট্রোরেল। বাংলাদেশ ডিজিটাল থেকে স্মার্টের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য আমরা স্মার্ট জনশক্তি গড়ে তুলবো। বুধবার দুপুরে মেট্রোরেল উদ্বোধন উপলক্ষে সুধী সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

দিয়াবাড়িতে ফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম মেট্রোরেলের উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার বেলা ১১টায় তিনি দিয়াবাড়ি খেলার মাঠে তৈরি উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত হন এবং ফলক উন্মোচন করে এ বৈদ্যুতিক ট্রেনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর ১৪ বছরে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেছেন, একটু আগেই মেট্রোরেলের উদ্বোধন করছি। নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে সেবা করার সুযোগ দিয়েছিলেন জনগণ। এজন্য সবাইকে শুভেচ্ছা।

বেলা ১১টা ৫ মিনিটে বহুল প্রতীক্ষিত ও দেশের প্রথম মেট্রোরেলের ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা ও প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানা এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন।

উত্তরায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১ টা ৫৩ মিনিটে দিয়াবাড়ী (উত্তরা) স্টেশন থেকে মেট্রোরেল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী নিয়ে আগারগাঁওয়ের দিকে ছুটে। প্রথম যাত্রার যাত্রী হিসেবে থাকেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিসভার সদস্য ও আমন্ত্রিত অতিথিরা। তবে সাধারণ যাত্রীরা মেট্রোরেলে বৃহস্পতিবার (২৯ ডিসেম্বর) চড়তে পারবেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পীকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিনুল্লা নুরী, মেট্রোরেল কোম্পানীর এমডি এম এন সিদ্দিকসহ সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।

মেট্রোরেলের চালকের আসনে থাকেন মরিয়ম আফিজা। মেট্রোরেল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণপরিবহনে নতুন যুগের সূচনা হয়। মেট্রোরেলের চালকের আসনে থাকা একজন নারী মরিয়ম আফিজা ‘ট্রেন অপারেটর’ হিসেবে নিয়োগ পেয়ে মেট্রোরেল চালানোর জন্য কয়েক মাস ধরে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রস্তুত হন। ১০ মিনিট ১০ সেকেন্ডে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পৌছে যাওয়া যাবে।

শুরুতে মেট্রোরেল চলবে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। ট্রেন অপারেটরদের পাশাপাশি ‘স্টেশন কন্ট্রোলার’ও মেট্রোরেল চালাবেন। তবে তাঁদের মূল দায়িত্ব থাকবে স্টেশন থেকে ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করা। এই পদেও একজন নারী রয়েছেন। তাঁর নাম আসমা আক্তার। তাঁকেও কয়েক মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের আগস্টে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে উত্তরা-আগারগাঁও অংশের উদ্বোধন হয়। এই পথে নয়টি স্টেশন আছে।

দেশে গণপরিবহনে নব যুগের যাত্রা শুরু করে চালু হলো মেট্রোরেল। আগামী ২৬ মার্চ থেকে উত্তরা-আগারগাঁও পথে পুরোদমে যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে মেট্রোরেল। উত্তরা আগারগাঁও পথের জন্য ৬ কোচবিশিষ্ট ১০টি ট্রেন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা হলো প্রথম তিন মাস মেট্রোরেল মাঝের কোনো স্টেশনে থামবে না। ১০ মিনিট পর পর ট্রেন যাত্রা শুরু করবে। দিনে চলবে ৪ ঘণ্টা। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। প্রতিটি ট্রেন সর্বোচ্চ ২০০ যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে। সপ্তাহে এক দিন মঙ্গলবার ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। অবশ্য টিকিট কাটা, ওঠানামা ও চলাচলে মানুষের অভ্যস্ততা তৈরি হলে ঘন ঘন ট্রেন চলবে, সব স্টেশনে থামবে এবং যাত্রীও বেশি নেওয়া হবে।

ভিড় বেশি হলে একটি ট্রেন কত যাত্রী নিতে পারবে, তার একটি হিসাবও আছে। ডিএমটিসিএল বলছে, একেকটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০৮ জন যাত্রী চলাচল করতে পারবেন। বসার ব্যবস্থা রয়েছে ৩০৬ জনের। ট্রেনের সাড়ে ৯ ফুট চওড়া কোচের দুই পাশে আসন থাকবে। মাঝে প্রশস্ত জায়গায় যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন।

এ মেট্রোরেল হচ্ছে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত ট্রেন। চলাচল করবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। মেট্রোরেলের টিকিট পুরোপুরিই কম্পিউটারাইজড। উত্তরার দিয়াবাড়িতে ডিপোয় একটি অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার (ওসিসি) স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ট্রেন কোথায় কোথায় থামবে, কত সময় থামবে, কত গতিতে চলবে এর সবই আগে থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে এসে দেশে মেট্রোরেল চালু হলো। তবে দেড় শ বছরের বেশি সময় আগে বিশ্বে এই ট্রেনে যাত্রা করে। চলুন দেখে নেওয়া যাক, কোন দেশে কবে মেট্রোরেলে উঠেছে মানুষ।

বিশ্বে প্রথম মেট্রোরেল চালু হয় ইউরোপে। ব্রিটেনের লন্ডন শহরে ১৮৬৩ সালের জানুয়ারিতে লোকোমোটিভ রেলের সূচনা হয়। আর ১৮৯০ সালে এসে লন্ডন মেট্রোতে যুক্ত হয় ইলেকট্রিক রেল। এখন দেশটিতে প্রায় ৪০২ কিলোমিটার পথে মোট মেট্রোর ১১টি লাইনে ট্রেন চলে। প্রতিদিন চলে অন্তত ৫৪০ ট্রেন। ২৭০টি স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়।

ইউরোপের আরেক দেশ হাঙ্গেরিতে মেট্রোরেলের সূচনা হয় ১৮৯৬ সালে। রাজধানী বুদাপেস্টের বাসিন্দারা ওই বছরের মে মাসে এই ট্রেনে ওঠে। মেট্রোরেল চালু হওয়া তৃতীয় দেশ স্কটল্যান্ড। ১৮৯৬ সালের ডিসেম্বরে দেশটির গ্লাসগো শহরে এই ট্রেনের যাত্রা করে।

১৮৯৭ সালে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বোস্টন সাবওয়ে চালু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আর ১৯০৪ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্কে চালু হয় মেট্রোরেল। দেশটির দ্বিতীয় ব্যস্ততম মেট্রোরেল চলে শিকাগো শহরে।

১৯০০ সালের ১৯ জুলাইয়ে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে চালু হয় মেট্রোরেল। ২০১৬ সালে প্যারিসে মেট্রোতে যাত্রী ছিল প্রায় ১.৫২ বিলিয়ন।

জার্মানির বার্লিনে ‘ইউ-বাহন’ নামে এই নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু ১৯০২ সালে। ১৫১ কিলোমিটর দ্যৈর্ঘ পথে মোট ১০টি লাইনে চলে এই ট্রেন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই পাতাল ট্রেন।

এশিয়ায় প্রথম মেট্রো নেটওয়ার্ক চালু হয় জাপানে। দেশটির রাজধানী টোকিওতে ১৯২৭ সালে এই ট্রেনের যাত্রা। এরপর চীনের বেইজিং ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে চালু হয় মেট্রো।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রথম মেট্রোরেল চালু হয় ১৯৮৪ সালে। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ওই বছরের অক্টোবরে এই ট্রেনের যাত্রা করে। দেশটির রাজধানী দিল্লিতে এই ট্রেনে মানুষ ওঠে ২০০২ সালের ডিসেম্বরে। এটি ভারতের অন্ততম ব্যস্ততম মেট্রো নেটওয়ার্ক।

বাংলাদেশে মেট্রোরেল চালুর দুই বছর আগে পাকিস্তানে এর যাত্রা শুরু। ২০২০ সালের অক্টোবরে দেশটির লাহোর শহরে এই নেটওয়ার্ক চালু হয়। এরপর আর কোনো শহরে এখনো এই ট্রেন চালু হয়নি।
আফ্রিকার দেশ মিসর, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, ইথিওপিয়ায় মানুষও অনেক আগেই মেট্রোতে ওঠে। সূত্র: রেলওয়ে টেকনোলজি ডটকম

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ