নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার
আমাদের জীবনে এখন মোবাইল ফোন এমন এক সঙ্গী, যাকে ছাড়া আধুনিক মানুষ কল্পনাই করতে পারে না। কিন্তু বিমানে চড়ার সময় এক অদ্ভুত নির্দেশ শোনা যায়—“Please switch off your mobile phones or turn them into airplane mode.” কেন এই নির্দেশ? কী এমন হয় যদি কেউ মোবাইলটি ‘এয়ারপ্লেন মোডে’ না রাখে? এটি কি শুধুই নিয়মের খাতিরে বলা, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ও নিরাপত্তাজনিত গভীর কারণ? আজকের আলোচনায় আমরা জানব—মোবাইলের এয়ারপ্লেন মোড আসলে কী, কেন এটি চালু করা জরুরি, আর না চালালে কী কী সমস্যা হতে পারে।
আরও পড়ুন:
এয়ারপ্লেন মোড কী?
এয়ারপ্লেন মোড বা ফ্লাইট মোড হলো একটি বিশেষ সেটিং, যা চালু করলে মোবাইল ফোনের সব রেডিও সিগন্যাল বা ওয়্যারলেস যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ তখন ফোন আর কোনো সেলুলার নেটওয়ার্ক, ওয়াইফাই, ব্লুটুথ, জিপিএস কিংবা মোবাইল ডেটার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না। ফোনটি তখন একদম “নেটওয়ার্ক নিঃশব্দ” অবস্থায় থাকে।
তবে ফোনের ক্যামেরা, ঘড়ি, নোটপ্যাড, মিউজিক প্লেয়ার কিংবা অফলাইন গেমের মতো ফিচারগুলো ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ, এটি ফোনকে এক প্রকার ‘সিগন্যালহীন স্মার্ট ডিভাইস’-এ পরিণত করে।
কেন এয়ারপ্লেন মোড চালু করতে বলা হয়?
বিমানের ককপিটে (যেখানে পাইলট বসেন) থাকে অসংখ্য সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি। এসব যন্ত্রের কাজ হলো বিমানের নেভিগেশন, উচ্চতা, গতি, আবহাওয়া, যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা। এখন মোবাইল ফোনও কিন্তু রেডিও সিগন্যাল পাঠায়—যা টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে।
এই সিগন্যালগুলো বিমানের যন্ত্রপাতির সঙ্গে ইন্টারফেয়ারেন্স (signal interference) তৈরি করতে পারে। যদিও আধুনিক বিমানে ইলেকট্রনিক শিল্ডিং ব্যবস্থায় এটি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত, তবু হাজার যাত্রীর শত শত ফোন একসাথে সিগন্যাল পাঠাতে শুরু করলে নেভিগেশন বা রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।
অতএব, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই বিমানে মোবাইল ফোনকে এয়ারপ্লেন মোডে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

ইন্টারফেয়ারেন্স কীভাবে ঘটে?
প্রতিটি মোবাইল ফোন যখন কোনো নেটওয়ার্ক খোঁজে বা টাওয়ারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, তখন এটি এক ধরণের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ (electromagnetic wave) ছড়ায়। বিমানের রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থাও একই তরঙ্গ ব্যবহার করে। ফলে যদি কাছাকাছি অসংখ্য ফোন একসাথে সিগন্যাল পাঠায়, তাহলে তা বিমানের যোগাযোগ রাডারে শব্দ বা বিকৃতি (noise) তৈরি করতে পারে।
এর ফলে পাইলটের কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে—যা উড়োজাহাজের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
সতর্কতার শিক্ষা
২০০৩ সালে এক মার্কিন বিমান সংস্থার ফ্লাইটে পাইলটদের রেডিওতে অদ্ভুত ‘বাজিং সাউন্ড’ শোনা যাচ্ছিল। পরে দেখা যায়, এক যাত্রী ফোনে ভিডিও দেখছিল এবং ফোনটি এয়ারপ্লেন মোডে ছিল না। যন্ত্রপাতি ত্রুটি নয়, মোবাইল সিগন্যালই ছিল সমস্যার উৎস। এর পর থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
এয়ারপ্লেন মোড না চালালে কী সমস্যা হতে পারে?
১. নেভিগেশন ত্রুটি:
বিমানের উচ্চতা বা গতি পরিমাপক যন্ত্রে সামান্য সিগন্যাল বিঘ্নই বড় ভুলের কারণ হতে পারে। এটি পাইলটের সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তি আনতে পারে।
২. রেডিও যোগাযোগে বাধা:
পাইলট ও কন্ট্রোল টাওয়ারের মধ্যে যোগাযোগে হঠাৎ ‘স্ট্যাটিক নয়েজ’ সৃষ্টি হতে পারে, যা নির্দেশনা শুনতে অসুবিধা করে।
৩. বিমানের যন্ত্রে ত্রুটি সংকেত:
কিছু ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ইন্টারফেয়ারেন্সের কারণে বিমানের অটোপাইলট বা সেন্সর সিস্টেমে ভুল তথ্য প্রদর্শিত হতে পারে।
৪. নেটওয়ার্কের জন্য অপ্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা:
আকাশে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক না পেয়ে বারবার সিগন্যাল খুঁজতে থাকে। এতে ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়, এমনকি ফোন গরমও হয়ে যায়।
৫. বিধি ভঙ্গের শাস্তি:
অনেক দেশে বিমানে ফোনের রেডিও সিগন্যাল চালু রাখা বিমান চলাচল আইন লঙ্ঘনের শামিল। এ জন্য অর্থদণ্ড বা সতর্কতা জারি হতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত নীতি
বর্তমানে কিছু উন্নত এয়ারলাইন্সে ‘ইন-ফ্লাইট ওয়াইফাই’ সুবিধা চালু আছে। সেখানে যাত্রীরা ওয়াইফাই ব্যবহার করতে পারেন, তবে মোবাইল নেটওয়ার্ক নয়। কারণ বিমানের নিজস্ব ওয়াইফাই রাউটার সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করে, যা বিমানের যন্ত্রপাতিতে বিঘ্ন ঘটায় না।
অর্থাৎ, প্রযুক্তি উন্নত হলেও মৌলিক নিয়ম একটাই—মোবাইলের সেলুলার সিগন্যাল বন্ধ রাখতে হবে।
মোবাইল ছাড়াও অন্যান্য ডিভাইস
শুধু ফোনই নয়—ট্যাব, স্মার্টওয়াচ, ল্যাপটপ, গেম কনসোল—সব ধরনের ওয়্যারলেস সিগন্যাল-চালিত ডিভাইসকেও এয়ারপ্লেন মোডে রাখতে হয়। আজকাল এসব ডিভাইসেও আলাদা ‘ফ্লাইট মোড’ অপশন থাকে।
এয়ারপ্লেন মোডের আরও উপকারিতা
বিমানে না থাকলেও অনেকেই এয়ারপ্লেন মোড ব্যবহার করেন বিভিন্ন কারণে:
- ব্যাটারি সেভ করার জন্য: নেটওয়ার্ক সার্চ বন্ধ থাকায় ব্যাটারি কম খরচ হয়।
- ঘুম বা বিশ্রামের সময়: কেউ যেন ফোন না করে বা নোটিফিকেশন না আসে।
- অফলাইন কাজের জন্য: লেখালেখি, গান শোনা বা ফটোগ্রাফির সময় মনোযোগ রাখতে।
- বিদেশে রোমিং চার্জ এড়াতে: বিমানে বা বিদেশে নামার পর অনিচ্ছাকৃত রোমিং বিল ঠেকাতে।
অর্থাৎ, এয়ারপ্লেন মোড কেবল বিমানের জন্য নয়, দৈনন্দিন জীবনেও একটি কার্যকরী ফিচার।
ভ্রান্ত ধারণা ভাঙা যাক
অনেক যাত্রী মনে করেন—“আমার একটা ফোন চালু থাকলেই বা কী হবে?” কিন্তু বিমানে যখন শতাধিক ফোন একসঙ্গে সিগন্যাল পাঠায়, তখন এর প্রভাব গুণিতক হারে বাড়ে। ফলে একজনের অসতর্কতা পুরো বিমানের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সুতরাং, এটি কেবল নিজের ব্যাপার নয়—বরং সব যাত্রীর সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রশ্ন।

পাইলট ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
পাইলটরা বলেন, “বিমানের সব সিস্টেম অত্যন্ত সংবেদনশীল। ছোট্ট এক ইন্টারফেয়ারেন্সই বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। তাই আমরা যাত্রীদের অনুরোধ করি, নিয়ম মেনে চলুন।”
একজন এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার বলেন, “আধুনিক বিমানে ঝুঁকি কম, কিন্তু ‘জিরো রিস্ক’ বলে কিছু নেই। এয়ারপ্লেন মোড চালু করা মানে আপনি আপনার অংশের দায়িত্ব পালন করছেন।”
নিরাপত্তা মানে শৃঙ্খলা
যেমনভাবে সিটবেল্ট বাঁধা নিরাপত্তার প্রতীক, তেমনি এয়ারপ্লেন মোডও একটি অদৃশ্য নিরাপত্তাবেষ্টনী। আকাশে উড়তে গেলে সামান্য শৃঙ্খলাই পারে শত জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
বিমানে উঠলে এয়ার হোস্টেসের কণ্ঠে শোনা যায়—“Please ensure all your mobile phones are in airplane mode.” অনেকেই ভাবেন, এটি শুধুই নিয়মের খাতিরে বলা কথা। কিন্তু বাস্তবে এটি আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা।
প্রযুক্তি যত উন্নত হোক, বিমান উড্ডয়ন এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। তাই আকাশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলটিকে ‘নীরব প্রহরী’ বানিয়ে দিন। এয়ারপ্লেন মোডে রাখুন—নিজের ও সবার নিরাপত্তার স্বার্থে।
এয়ারপ্লেন মোড শুধু একটি মোবাইল সেটিং নয়—এটি দায়িত্বশীলতার প্রতীক। আকাশে উড়তে চাইলে, শৃঙ্খলার এই ছোট নিয়ম মানাটাই আমাদের বড় দায়িত্ব।








