সায়ন্তনী সেন, পথে প্রান্তরে
দেশে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) সম্প্রতি প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করেছে ২ লাখ ৯ হাজার ১০০ টাকা—যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও চলছে স্বর্ণের উর্ধ্বগতি; প্রতি আউন্সের দাম ৪,০০০ ডলার ছুঁয়েছে, যা এক দশকের মধ্যে নজিরবিহীন। প্রশ্ন হচ্ছে—এই উর্ধ্বগতির পেছনে আসল কারণগুলো কী? নিচে পাঁচটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হলো।
১. বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাই স্বর্ণের বাজারে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা, ইউরোপে মন্দার আশঙ্কা, এবং রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইসরাইল-গাজা যুদ্ধের প্রভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে স্পট গোল্ডের দাম প্রতি আউন্সে পৌঁছেছে ৪,০৩৭.৯৫ ডলারে—যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। বিনিয়োগকারীরা এখন শেয়ার ও বন্ড বাজারের অস্থিরতার বদলে স্বর্ণকেই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
২. নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের পুনর্জাগরণ
অর্থনৈতিক মন্দা বা মুদ্রাস্ফীতির সময় মানুষ সাধারণত ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে স্বর্ণে বিনিয়োগ করে থাকে। কারণ, এই ধাতুর মূল্য দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকে এবং প্রায়ই বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিনিয়োগকারীরা আবারও স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ স্বর্ণবাজারে ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন এই ধাতুতে।

৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়ের প্রতিযোগিতা
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র আনতে এখন স্বর্ণ ক্রয়ে আগ্রহী। ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ১,০০০ টনের বেশি স্বর্ণ ক্রয় করা হচ্ছে—যা আগের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ।
বিশেষ করে চীন, তুরস্ক, পোল্যান্ড, ভারত ও আজারবাইজান বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা শুধু মূল্যবৃদ্ধিই ঘটাচ্ছে না, বরং বাজারে সরবরাহও কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে দামের উর্ধ্বগতি আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
৪. টাকার অবমূল্যায়ন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি
বাংলাদেশে স্বর্ণ সরাসরি উৎপাদন হয় না, ফলে দেশের বাজার নির্ভর করে আন্তর্জাতিক দামের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন।
২০২১ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত টাকার মান ডলারের বিপরীতে প্রায় ৪৩ শতাংশ কমেছে। এতে স্বর্ণ আমদানির ব্যয় বেড়ে গেছে, যা দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ।
বর্তমানে বেশিরভাগ স্বর্ণ বিদেশফেরত যাত্রীদের লাগেজ রুলসের আওতায় আসে। ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে এই চ্যানেলেও স্বর্ণের দাম বাড়ছে।

৫. সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি
বাংলাদেশে প্রতিবছর ২০ থেকে ৪০ টন স্বর্ণের চাহিদা থাকে। কিন্তু এর বড় অংশই আসে অনানুষ্ঠানিক পথে—যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গত অর্থবছরে দেশে প্রবেশ করেছে প্রায় ৪৫.৬ টন স্বর্ণ, তবে বাজার চাহিদার তুলনায় তা এখনো কম।
বিশেষ করে বিয়ের মৌসুম বা উৎসবের সময় সরবরাহ সংকট প্রকট হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাচারের সমস্যা—অভিযোগ রয়েছে, বৈধভাবে আমদানিকৃত স্বর্ণের একটি অংশ চোরাপথে ভারতে চলে যায়। এতে স্থানীয় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়ে দামের ওপর চাপ পড়ে।

সম্ভাব্য প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ ক্রয় এবং টাকার অবমূল্যায়ন—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে বর্তমান দামের উর্ধ্বগতিকে দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে গয়না শিল্প ও ভোক্তা বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে যারা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য স্বর্ণ এখনো একটি স্থিতিশীল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, স্বর্ণের বর্তমান দামের উর্ধ্বগতি কোনো একক কারণের ফল নয়; বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি, মুদ্রা বিনিময় হার, এবং বাজার মনস্তত্ত্বের সম্মিলিত প্রভাব। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নিকট ভবিষ্যতে এই দামের দ্রুত পতনের সম্ভাবনা খুবই কম—বরং এটি আরও কিছু সময় উচ্চ পর্যায়ে স্থিত থাকতে পারে।








