,

আইএমএফ নয়, এবার অগ্রাধিকার দেশের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আইএমএফের প্রভাব কমিয়ে দেশের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।মুদ্রানীতিতে শিথিলতা, মূল ফোকাস কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে

চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নির্ধারিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে দেশের মানুষের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জুলাইয়ের শেষ দিকে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।

লক্ষ্য-অর্জন পর্যালোচনা ও স্টেকহোল্ডার মতামত

মুদ্রানীতি তৈরির অংশ হিসেবে গত মুদ্রানীতির লক্ষ্য ও অর্জন পর্যালোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মে মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ চলছে, এবং জুন মাসের তথ্য এ মাসের মাঝামাঝি পেলে লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব অর্জনের ফারাক আরও স্পষ্ট হবে।

এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে মতবিনিময়ের মাধ্যমে অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) প্রত্যাশা জানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব আলোচনায় সুদের হার কমানো, টাকার প্রবাহ বাড়ানো, বেসরকারি খাতে ঋণের সরবরাহ জোরদার এবং কর্মসংস্থানের হার বাড়ানোর প্রস্তাব উঠে এসেছে, যেগুলো নতুন মুদ্রানীতিতে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়া হবে।

সংকোচনমুখী নীতির ধকল

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়, যার প্রভাবে বাংলাদেশে ডলার সংকট দেখা দেয়, মুদ্রার মান পড়ে যায়, মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং কর্মসংস্থান হ্রাস পায়। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা এখনো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, টানা তিন অর্থবছরের সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির পর এবার কিছুটা শিথিল নীতি গ্রহণ জরুরি।

২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া সংকোচনমুখী নীতি ২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে, যা আইএমএফের চাপেই ২০২৩-২৪ সাল থেকে আরও কঠোর করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নীতির সুদহার ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ৮-৯ শতাংশ থেকে ১২-১৮ শতাংশে উন্নীত করে। এর পরেও ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটে অনেকেই ঋণ পাচ্ছেন না।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের চিত্র

সরকারি ঋণ গ্রহণের হার বেশি থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ তলানিতে নেমে এসেছে। বিদায়ী অর্থবছরে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯.৮ শতাংশ, কিন্তু মে পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে মাত্র ৫.১২ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ৭.১৯ শতাংশ।

টানা তিন বছর সংকোচনমুখী নীতির ফলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কর্মসংস্থানের ঘাটতি থেকেই শুরু হয় কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আইএমএফের অবস্থান ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

আইএমএফ ৫-৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা না পাওয়া পর্যন্ত সংকোচনমুখী নীতি বজায় রাখার সুপারিশ করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের মতো দেশে সম্ভব নয়। অনেক দেশে মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানো গেলেও বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন।

বর্তমান সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ—যেমন ডলারের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় ঋণ বন্ধ করা এবং পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ—এর ফলে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে। গত মে মাসে এটি কমে দাঁড়ায় ৯.০৫ শতাংশ, যেখানে গত বছরের জুলাইয়ে এটি ছিল ১১.৬৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ১৪.১০ শতাংশ থেকে কমে ৮.৫৯ শতাংশে নেমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা ৬ শতাংশে নেমে আসবে।

শিথিল মুদ্রানীতির সম্ভাব্য রূপরেখা

নতুন মুদ্রানীতিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে মূল লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এজন্য কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (CMSMEs) ঋণের জোগান বাড়ানো হবে। এনজিও লিংকেজ ঋণ কর্মসূচি চালু এবং পিকেএসএফ-এর মাধ্যমে ঋণ জোগানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকেও কম সুদে ঋণের জোগান দেওয়া হবে।

ব্যাংকগুলোকে এসব তহবিল থেকে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে বাধ্য করা হবে। বাজেটের কর সুবিধাপ্রাপ্ত খাতগুলোতেও ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বড় শিল্প ও রপ্তানি খাত চাঙা করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কৌশল নেওয়া হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি সরকারি খাতের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

জনগণের চাহিদা প্রথম

নতুন সরকারের আমলে ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা অর্জিত হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। প্রয়োজনে আইএমএফের আপত্তিকেও উপেক্ষা করা হবে।

রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় স্থানীয় অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী ও এনজিও প্রতিনিধিরা একমত হন যে সুদের হার কমানো প্রয়োজন। সিলেট ও ঢাকাতেও এমন মতবিনিময় করা হবে। এবারের মুদ্রানীতির খসড়া প্রণয়নে দেশের মানুষের চাওয়া ও অংশীজনদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে, আইএমএফের নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ