শুক্রবার, ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ট্রাম্পের ৩৫% শুল্ক আরোপ: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে এই শুল্ক কার্যকর হবে যদি এর মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি না হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন দেশটি রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের চেষ্টায় রয়েছে।

এই ঘোষণার প্রেক্ষাপট এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান:

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির অভিযোগে পাল্টা শুল্ক আরোপ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন সেই একই নীতিকে সম্প্রসারিত করে এবার আরও ১৪টি দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। ট্রাম্প তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ‘অবিচার’ তৈরি করছে এবং দেশটি যদি মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদনের সুযোগ না দেয় বা মার্কিন পণ্যের বাজার উন্মুক্ত না করে, তাহলে এই শুল্ক অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা:

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাক (RMG) খাতের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ—প্রায় ১৮-২০ শতাংশ পণ্য—যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। শুধু ২০২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশের বেশি পোশাক খাতের পণ্য। ফলে এই খাতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

১. তৈরি পোশাক খাতের বিপর্যয়:
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। ৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে এই খাতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জে ফেলবে। বর্তমানে ভিয়েতনাম, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, এবং কেবলমাত্র শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া এলডিসিভুক্ত কিছু দেশ মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। ফলে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

২. কর্মসংস্থান ও সামাজিক প্রভাব:
পোশাক খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করে। শুল্কের কারণে রপ্তানি কমে গেলে, শ্রমিক ছাঁটাই এবং কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে। নারীকর্মীদের প্রাধান্য থাকায়, এর সামাজিক প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী।

৩. বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ধস:
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যদি মার্কিন বাজারে রপ্তানি কমে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর সরাসরি চাপ পড়বে। এতে রিজার্ভ কমে যাওয়া, টাকার মান হ্রাস পাওয়া এবং আমদানি নির্ভর খাতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

৪. ব্যবসায়িক আস্থা ও বিনিয়োগের ঝুঁকি:
শুল্কের কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। এর ফলে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) হ্রাস পেতে পারে।

৫. বিকল্প বাজারে চাপ বাড়বে:
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে, বাংলাদেশ বিকল্প বাজার যেমন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু একইসাথে এই দেশগুলোর ওপর চাপও বাড়বে। তাছাড়া ইউরোপে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে।

সরকারের করণীয় ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ:

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে শুল্ক ইস্যুতে আলোচনার জন্য প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছে। এখন দরকার একটি সুসংগঠিত, যুক্তিনির্ভর কূটনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝানো যাবে যে, বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতি এবং মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপস্থিতি উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।

এছাড়া নিম্নলিখিত কৌশলগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

  • দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া
  • যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে যৌথ বিনিয়োগের আহ্বান
  • যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক লবিস্টদের মাধ্যমে সমর্থন অর্জন
  • প্রযুক্তিগত ও মানোন্নয়নসহ তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো

দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি: বহুমুখীকরণই ভবিষ্যতের পথ:

এই ধরণের বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের জন্য একমাত্র টেকসই সমাধান হচ্ছে রপ্তানির বহুমুখীকরণ। তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি আইটি, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য, ফার্নিচার, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং জাহাজ নির্মাণের মতো খাতগুলোর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। একইসাথে নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

ট্রাম্পের ঘোষিত ৩৫ শতাংশ শুল্ক নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি অস্বস্তিকর বার্তা। তবে এটিকে ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কতা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পরিবর্তনশীল নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে, বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে হবে এবং নিজস্ব অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ ও সক্ষমতায় আরও শক্তিশালী করতে হবে। এখন সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার। সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।

(লেখিকা: নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক পথে প্রান্তরে) 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ