রুবেল ভূঁইয়া, স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকার সকাল এখন আর সোনালি আলোয় ভেসে ওঠে না—জেগে ওঠে ধোঁয়া, ধুলা আর এক অদৃশ্য কুয়াশায় মোড়া ধূসর আকাশে। শীতের সময় এ দৃশ্য কিছুটা স্বাভাবিক মনে হলেও এখন সেটা বছরের প্রায় প্রতিটি দিনেই দেখা যায়। একসময় যেই শহর ছিল নদীমাতৃক সৌন্দর্যে ভরা, সেই ঢাকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ু মান নির্ধারণ সংস্থা আইকিউএয়ার–এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম দূষিত শহর, যার বায়ুমান সূচক (AQI) স্কোর ১৬১—অর্থাৎ ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়।
এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—এই শহরে আমরা কীভাবে শ্বাস নিচ্ছি? আমাদের শিশুরা, প্রবীণরা, কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে টিকে থাকবে এই ধোঁয়াশার নগরে?
বিষাক্ত বাতাসের শহর
আইকিউএয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উপাদান হলো বাতাসে ভাসমান অতিক্ষুদ্র কণা PM 2.5। এর ব্যাস মাত্র ২.৫ মাইক্রোমিটার—অর্থাৎ একটিমাত্র মানুষের চুলের ব্যাসের প্রায় ৩০ ভাগের এক ভাগ। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে ফুসফুসের গভীরে গিয়ে রক্তে মিশে যেতে পারে।
২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ সকালে ঢাকায় পিএম ২.৫ এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মানদণ্ডের চেয়ে ১৪ গুণ বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। যার মানে দাঁড়ায়, ঢাকায় একজন মানুষ প্রতিদিন এমন বাতাসে শ্বাস নিচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিকে সরাসরি আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার দূষণে প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি করা মানে হলো ধীরে ধীরে নিজের শরীরে বিষ জমা করা।

কেন এত দূষণ?
ঢাকার দূষণের উৎস খুঁজলে তা দেখা যায় প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি সড়কে, প্রতিটি নির্মাণাধীন স্থানে–
১. নির্মাণকাজের ধুলাবালি: শহরের রাস্তাঘাট, ড্রেন, ভবন নির্মাণ, মেট্রোরেল ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে প্রতিদিন টন টন ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এসব স্থানে ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানির ছিটানো বা নেট কভার ব্যবহার প্রায় দেখা যায় না।
২. যানবাহনের ধোঁয়া: পুরোনো ও রক্ষণাবেক্ষণহীন যানবাহন থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়া ঢাকার বাতাসের বড় শত্রু। বিশেষ করে বাস, ট্রাক ও মাইক্রোবাসের নিঃসরণ বায়ুতে নাইট্রোজেন ডাই–অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বাড়াচ্ছে।
৩. ইটভাটা ও শিল্প নিঃসরণ: ঢাকার আশপাশে প্রায় তিন শতাধিক ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর অনেকই এখনও পুরনো প্রযুক্তিতে চলে। এসব ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও সালফার যৌগ রাজধানীর বাতাসে মিশে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করছে।
৪. আবর্জনা পোড়ানো: শহরের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিতভাবে খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো হয়। এর ধোঁয়ায় থাকে ডাই–অক্সিন ও ফিউরান নামক ক্যানসার–সৃষ্টিকারী উপাদান।
৫. জনসংখ্যার ঘনত্ব: প্রায় দুই কোটি মানুষের শহরে গৃহস্থালি রান্না, গাড়ি চলাচল, শিল্প বর্জ্য—সব মিলিয়ে একটি অবিরাম দূষণচক্র তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন:
সবচেয়ে দূষিত অঞ্চলগুলো
আইকিউএয়ারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঢাকার সবচেয়ে দূষিত এলাকা হলো পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি, যেখানে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) স্কোর ১৭৭। এর পরেই রয়েছে গোড়ান (১৬৫), মাদানি সরণি (১৬৩), দক্ষিণ পল্লবী (১৬৩), মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং (১৬৩), কল্যাণপুর (১৫৬), শান্তা ফোরাম (১৫৩) ও গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (১৫২) এলাকা।
এসব অঞ্চলে বাতাস এতটাই অস্বাস্থ্যকর যে সকালবেলার হাঁটা কিংবা শিশুরা বাইরে খেলতে যাওয়া—সবকিছুই ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্বের অন্য শহরের সঙ্গে তুলনা
আজকের বৈশ্বিক বায়ুমান সূচকে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। পাকিস্তানের লাহোর তালিকার শীর্ষে, ভারতের দিল্লি দ্বিতীয়, এবং পাকিস্তানের করাচি তৃতীয় স্থানে। চতুর্থ স্থানে রয়েছে চীনের উহান।
| ক্রম | শহর | দেশ | AQI স্কোর | বায়ুর মানের অবস্থা |
|---|---|---|---|---|
| ১ | লাহোর | পাকিস্তান | ২৭৯ | অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর |
| ২ | দিল্লি | ভারত | ২৭০ | অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর |
| ৩ | করাচি | পাকিস্তান | ১৭৩ | অস্বাস্থ্যকর |
| ৪ | উহান | চীন | ১৬৩ | অস্বাস্থ্যকর |
| ৫ | ঢাকা | বাংলাদেশ | ১৬১ | অস্বাস্থ্যকর |
এই ছক থেকে স্পষ্ট হয় যে, দক্ষিণ এশিয়া এখন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত অঞ্চল। বিশ্লেষকরা বলছেন, “আমরা একই আকাশ ভাগাভাগি করছি, কিন্তু একই সঙ্গে ভাগ করছি একই বিপর্যয়।”

দূষণের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি
বায়ুদূষণ এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশগত নয়, একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ বায়ুদূষণ–সংক্রান্ত রোগে মারা যায়।
ঢাকার বাতাসে থাকা PM 2.5 কণাগুলো শ্বাসযন্ত্র, রক্তনালী, এমনকি মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গুরুতর—তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, ফুসফুস ছোট হয়ে যায়, এবং হাঁপানি বা অ্যালার্জির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, “এখন ঢাকায় দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা মানে হলো ধীরে ধীরে শরীরকে বিষক্রিয়ায় অভ্যস্ত করে তোলা।”
বায়ু মান সূচক অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস
| স্কোর | শ্রেণি | বর্ণনা |
|---|---|---|
| ০–৫০ | ভালো | শ্বাস নেওয়া নিরাপদ |
| ৫১–১০০ | মাঝারি | সাধারণভাবে সহনীয় |
| ১০১–১৫০ | সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর | হাঁপানি বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্নদের ঝুঁকি |
| ১৫১–২০০ | অস্বাস্থ্যকর | সাধারণ জনগণের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ |
| ২০১–৩০০ | খুবই অস্বাস্থ্যকর | দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি |
| ৩০১+ | দুর্যোগপূর্ণ | তীব্র বায়ুদূষণ; শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগের আশঙ্কা |
ঢাকার ১৬১ স্কোরের মানে হলো—এই বাতাসে স্বাভাবিক জীবনযাপনও বিপজ্জনক।

অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়
বায়ুদূষণ কেবল স্বাস্থ্যক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৩.৯ শতাংশ হারিয়ে যাচ্ছে বায়ুদূষণ–জনিত স্বাস্থ্যব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসে।
অফিসকর্মীদের অসুস্থতা, শিশুদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি, এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের কারণে অর্থনীতির উপর এর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
সরকারি উদ্যোগ: যথেষ্ট নয়
সরকার বিভিন্ন সময় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন—
- পুরোনো যানবাহন ধাপে ধাপে বন্ধের উদ্যোগ
- ইটভাটা আধুনিকায়নে হাইব্রিড প্রযুক্তির ব্যবহার
- নগরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা
- যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা
তবে বাস্তবে এই পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন অপ্রতুল। পরিবেশবিদদের মতে, “নীতি আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই।” ফলে দূষণ কমার পরিবর্তে প্রতিবছরই নতুন রেকর্ড গড়ে।
সমাধানের পথ: এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী দশকে ঢাকায় ‘পরিষ্কার বাতাস’ পাওয়া বিলাসিতা হয়ে যাবে। সমাধানের পথগুলো হতে পারে—
- নগর পরিকল্পনায় বায়ু নিয়ন্ত্রণ অন্তর্ভুক্ত করা।
- প্রতিটি নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করা।
- ইটভাটা শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার।
- সবুজ অবকাঠামো বাড়ানো—ছাদবাগান, উন্মুক্ত পার্ক ও বৃক্ষরোপণ।
- পুরোনো যানবাহন অপসারণ ও বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।
- বর্জ্য পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
- স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেমে দূষণ উৎস শনাক্ত ও জরিমানা নিশ্চিত করা।

জনসচেতনতা—সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র
যে কোনো সরকারি নীতির চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে নাগরিকদের সচেতনতা। অনেক সময় ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনে। যেমন—
- অপ্রয়োজনে গাড়ি চালানো কমানো
- রাস্তার পাশে আবর্জনা না পোড়ানো
- গাছ লাগানো ও সংরক্ষণে উৎসাহী হওয়া
- দূষণবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ
শেষ কথা
ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি স্বপ্ন, সংগ্রাম ও জীবিকার শহর। কিন্তু সেই শহরের বাতাস এখন প্রতিদিন আমাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে নিঃশব্দে। বায়ুদূষণ আজ এক নিঃশব্দ ঘাতক—যে ঘাতকের হাতে আমরা সবাই বন্দি।
তবুও আশার আলো আছে—যদি এখনই সরকার, নাগরিক ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করে। শহরকে শুধু বড় নয়, বাসযোগ্য করাই এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার আকাশকে আবার নীল দেখতে চাইলে, প্রথমেই আমাদের লাগবে পরিষ্কার নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার পুনরুদ্ধার করা।








