রুবেল ভূঁইয়া, স্টাফ রিপোর্টার
আমাদের মনের পেছনের রহস্য
আমরা প্রায়ই ভাবি—আমাদের মেজাজ, আবেগ আর চিন্তা-ভাবনা পুরোপুরি আমাদের নিজের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু শরীরের ভেতর এমন কিছু অদৃশ্য শক্তি কাজ করে, যাদের ইঙ্গিতে কখনো আমরা আনন্দে ভাসি, কখনো বিষণ্ণতায় ডুবে যাই। এই অদৃশ্য শক্তিগুলোর নাম হরমোন।
হরমোন কেবল শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখে না; তারা নীরবে আমাদের মন, মেজাজ, চিন্তা ও মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করে। কখনো তারা আমাদের উদ্যমী করে তোলে, আবার কখনো নিঃশব্দে টেনে নেয় ক্লান্তি বা দুঃখের দিকে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হরমোন আসলে একেকটি ‘রাসায়নিক বার্তাবাহক’। শরীরের ভেতর নির্দিষ্ট অঙ্গ বা গ্রন্থি থেকে এগুলো নিঃসৃত হয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, গিয়ে নির্দিষ্ট কোষে বার্তা দেয়—“এই কাজটা এখন করতে হবে।”
এই নির্দেশে কখনো কোষ শক্তি জমা করে, কখনো নতুন কোষ জন্ম দেয়, আবার কখনো কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। যেমন ইনসুলিন নামের হরমোন লিভার ও পেশিকে বলে দেয় রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজ শোষণ করে রাখতে।
এইভাবেই শরীরের প্রতিটি অংশের মধ্যে ঘটে চলে এক সূক্ষ্ম অথচ জটিল সমন্বয়।
হরমোনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ
মানুষের শরীরে এখন পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি হরমোন শনাক্ত হয়েছে। এরা মিলে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের ঘুম, বৃদ্ধি, যৌনতা, প্রজনন, তাপমাত্রা, ক্ষুধা, এমনকি আমাদের মানসিক স্থিতিও।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নাফিসা ইসমাইল বলেছেন,
“হরমোন আমাদের মেজাজ আর আবেগে গভীর প্রভাব ফেলে। তারা মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, এমনকি মস্তিষ্কে নতুন কোষ জন্ম বা পুরোনো কোষ মারা যাওয়ার প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে।”
বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন—মানুষের জীবনে যখন বড় কোনো হরমোন পরিবর্তন ঘটে, তখন মানসিক ওঠানামাও বাড়ে। যেমন কৈশোর, গর্ভাবস্থা বা মেনোপজের সময়। এ সময় নারীদের মধ্যে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ বা মানসিক অস্থিরতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
কৈশোরের আগে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার প্রায় সমান। কিন্তু কৈশোরে পৌঁছে মেয়েদের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়ে যায়, এবং এই পার্থক্য প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও থেকে যায়। এর কারণ, যৌন হরমোন—ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন—যারা কেবল প্রজনন নয়, মনের অবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করে।

নারীদের জীবনে হরমোনের ঢেউ
প্রতি মাসে নারীর শরীরে হরমোনের ওঠানামা ঘটে। মাসিকের আগের সপ্তাহগুলোতে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা হঠাৎ কমে যায়। তখন অনেক নারী বিরক্ত, দুঃখী বা অকারণে উদ্বিগ্ন বোধ করেন। কারও ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন এতটাই তীব্র হয় যে, তা প্রী-মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিজঅর্ডার (PMDD)-এ পরিণত হয়।
এটি একধরনের হরমোন–সম্পর্কিত মুড ডিজঅর্ডার, যেখানে মুড সুইং, গভীর দুঃখবোধ, উদ্বেগ, এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও দেখা দেয়।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিসা হান্টসু বলেন,
“PMDD আক্রান্ত নারীদের জন্য এটি মাসে মাসে এক ধরনের যন্ত্রণা। এটি তাদের দৈনন্দিন জীবন, কাজ, সম্পর্ক—সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে।”
অন্যদিকে, ডিম্বস্ফোটনের ঠিক আগে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়লে নারীরা সাধারণত বেশি প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী ও সুখী বোধ করেন। প্রোজেস্টেরনের একটি উপজাত ‘অ্যালোপ্রেগন্যানোলোন’ আবার শরীরকে শান্ত করে। এমনকি কেউ যদি ইনজেকশনের মাধ্যমে এই পদার্থ গ্রহণ করেন, তা মনকে প্রশান্ত করে তোলে।
গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পরও নারীর শরীরে হরমোনের বড় পরিবর্তন ঘটে। সন্তান জন্মের পর প্রোজেস্টেরন ও ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হঠাৎ পড়ে যায়, যার ফলে প্রায় ১৩ শতাংশ নারী ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’-এ ভোগেন।
মেনোপজ বা ঋতুবন্ধের সময়ও একই দৃশ্য। তখন হরমোন ওঠানামা করে অনিয়মিতভাবে। কেউ এই সময়টা সহজে পাড়ি দেন, আবার কারও জন্য এটি হয়ে ওঠে মানসিক ঝড়ের সময়।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর অধ্যাপক লিসা গালিয়া বলেন,
“এটি শুধু হরমোনের মাত্রা কম বা বেশি হওয়ার বিষয় নয়। বরং দ্রুত ওঠানামার সময়টাই মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে। কেউ কেউ এই পরিবর্তনে অত্যন্ত সংবেদনশীল, আবার কেউ সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন।”

পুরুষের মনেও প্রভাব ফেলে হরমোন
শুধু নারীরাই নয়, পুরুষের জীবনেও হরমোনের প্রভাব স্পষ্ট। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে। পরিবর্তনটি যদিও ধীর, তবে এটি মেজাজ, উদ্যম এবং আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে।
নাফিসা ইসমাইল বলেছেন,
“পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের পরিবর্তনও মনের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এখনো খুব কম।”
যখন টেস্টোস্টেরন কমে যায়, তখন কেউ কেউ অকারণ ক্লান্ত, মনমরা বা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে সবার ক্ষেত্রে তা ঘটে না। অর্থাৎ, হরমোনের প্রতি সংবেদনশীলতা ব্যক্তি ভেদে আলাদা।
মস্তিষ্কের সঙ্গে হরমোনের বন্ধুত্ব
হরমোন মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিন নামের দুটি রাসায়নিকের মাত্রা বাড়ায়। এই দুটি রাসায়নিকই সুখ, উদ্যম, মনোযোগ ও প্রেরণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইস্ট্রোজেন আবার মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরি করতে সাহায্য করে—বিশেষ করে হিপোক্যাম্পাসে, যা স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িত।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বিষণ্ণতা বা আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত মানুষের হিপোক্যাম্পাসে নিউরনের সংখ্যা কমে যায়। অথচ অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা কিছু মাদকজাতীয় উপাদান (যেমন সাইকেডেলিক ড্রাগ) নতুন নিউরন তৈরি করতে সাহায্য করে।
“ইস্ট্রোজেন মস্তিষ্কের কোষকে রক্ষা করে,” বলেন ইসমাইল। “মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন কমে গেলে আমরা দেখি নারীদের স্মৃতিভ্রংশ বা ‘ব্রেইন ফগ’ দেখা দেয়, কারণ তখন নিউরনের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।”
স্ট্রেস হরমোন: বন্ধু না শত্রু?
স্ট্রেস বা উদ্বেগের সময় শরীরের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় কর্টিসল, যাকে বলা হয় স্ট্রেস হরমোন। এটি আমাদের শরীরকে বিপদের সময় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন কেউ দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তখন এই কর্টিসল শরীরে বিষের মতো কাজ করে।
এটি মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস, অ্যামিগডালা ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলাফল—স্মৃতি দুর্বল হয়, মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।
“অ্যামিগডালা আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে,” বলেন ইসমাইল। “এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ সহজে রেগে যায়, দুঃখ থেকে বের হতে পারে না। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হলে মনোযোগ ও যুক্তিবোধ নষ্ট হয়।”

ভালোবাসার হরমোন অক্সিটোসিন
অন্যদিকে, এক হরমোন আছে যা স্ট্রেসের ঠিক উল্টো কাজ করে—অক্সিটোসিন। একে বলা হয় ভালোবাসার হরমোন। এটি মা-শিশুর বন্ধন, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও আস্থার সঙ্গে যুক্ত।
অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয় সন্তান জন্ম, বুকের দুধ খাওয়ানো বা ভালোবাসার মুহূর্তে। এটি মানুষের মনে নিরাপত্তা, সহানুভূতি ও সংযোগের অনুভূতি তৈরি করে।
“যখন আমরা ভালোবাসা, নিরাপত্তা বা সমর্থন অনুভব করি, অক্সিটোসিন কর্টিসলের প্রভাব কমিয়ে দেয়,” বলেন ইসমাইল।
গবেষণায় দেখা গেছে, অক্সিটোসিন নাকের স্প্রে ব্যবহার করলে মানুষ বেশি সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করে। যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন এটি কীভাবে মস্তিষ্কে কাজ করে।
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
গলার নিচে প্রজাপতির মতো দেখতে থাইরয়েড গ্রন্থি উৎপন্ন করে দুটি হরমোন—T3 ও T4। এগুলো শরীরের তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন ও বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
কিন্তু যখন এই হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন উদ্বেগ দেখা দেয়; আর কমে গেলে আসে ক্লান্তি, অবসাদ ও বিষণ্ণতা।
চিকিৎসকরা বলেন,
“অনেক সময় রোগী যখন মানসিক পরিবর্তনের অভিযোগ নিয়ে আসেন, প্রথমেই আমরা হরমোন পরীক্ষা করি। কারণ হরমোনের ভারসাম্য ঠিক করলে অনেক সময় মনও ঠিক হয়ে যায়।”

হরমোন–ভিত্তিক চিকিৎসার নতুন দিগন্ত
বিজ্ঞানীরা এখন হরমোনের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে মানসিক রোগের নতুন চিকিৎসা খুঁজছেন। ব্রেক্সানোলন নামের একটি ওষুধ, যা প্রোজেস্টেরনের উপজাত অ্যালোপ্রেগন্যানোলোনের মতো কাজ করে, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন-এ চমৎকার ফল দেখিয়েছে।
তাছাড়া, যাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম, তাদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন থেরাপি ও অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট একসঙ্গে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া গেছে। মেনোপজে থাকা নারীদের জন্য হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) অনেক সময় বিষণ্ণতা কমাতে সহায়তা করে।
তবে সবাই এই চিকিৎসায় সমান সাড়া দেন না। কারও ক্ষেত্রে এটি আশীর্বাদ, কারও ক্ষেত্রে উল্টো সমস্যার কারণ। এর কারণ, মানুষে মানুষে হরমোন সংবেদনশীলতার পার্থক্য বিশাল।
শেষকথা
আমাদের মন কেবল চিন্তা, ইচ্ছাশক্তি বা মানসিক প্রশিক্ষণে চলে না—চলে শরীরের অদৃশ্য রাসায়নিক বার্তাবাহকদের নির্দেশে। হরমোনের ভারসাম্য মানেই মানসিক ভারসাম্য।
তাই সুস্থ মন চাইলে, শরীরের এই সূক্ষ্ম রাসায়নিক ব্যবস্থার যত্ন নিতে হবে। ভালো ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, স্ট্রেস কমানো—সবই হরমোনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
মন ভালো রাখতে চাইলে শুধু চিন্তায় নয়, যত্ন নিতে হবে শরীরেরও—কারণ মন ও শরীরের সম্পর্ক অদৃশ্য হলেও অবিচ্ছেদ্য।
(জ্যাসমিন ফক্স-স্কেলি এর লেখা অবলম্বনে। জ্যাসমিন ফক্স-স্কেলি একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞান সাংবাদিক, যিনি বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও নিউ সায়েন্টিস্টে বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানবিষয়ক লেখা প্রকাশ করেন)








