ধর্ম মন্ত্রণালয় চলতি বছর হজ মৌসুমে পারমিট ছাড়া হজে অংশ না নিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতি কঠোরভাবে আহ্বান জানিয়েছে। হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, হজযাত্রীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতেই এই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
২০২৫ সালের হজ মৌসুমে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে, কেউ যেন ভিজিট ভিসায় সৌদি আরব গিয়ে মক্কা নগরী বা আশপাশের পবিত্র স্থানগুলোতে অবস্থান না করেন। যারা এমনটি করবেন, তাদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে বলে জানানো হয়েছে। এই নির্দেশনা শুধু সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য নয়, দেশের নাগরিকদের জন্যও প্রযোজ্য।
ধর্ম মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, কেউ যদি ভিজিট ভিসাধারীকে হজ পালনে সহযোগিতা করেন, যেমন তাদের আশ্রয় দেন, পরিবহন বা পবিত্র এলাকাগুলোতে প্রবেশে সহায়তা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
সৌদি সরকার ইতিমধ্যে চলতি মৌসুমে হজ পালনের জন্য নতুন কিছু কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে। এসব নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র হজ পারমিটধারী ব্যক্তি, যারা সরকারের অনুমোদিত দলভুক্ত, বৈধ নিবন্ধিত হজযাত্রী, অথবা মক্কায় বসবাসকারী বৈধ বাসিন্দা (ইকামাধারী), তারাই কেবল হজে অংশ নিতে পারবেন। কেউ যদি এই নিয়ম ভঙ্গ করেন, তবে তার বিরুদ্ধে ২০ হাজার সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করা হবে। এমনকি, হজে অংশ নেওয়ার সহযোগিতা করলে জরিমানা বাড়িয়ে এক লাখ রিয়াল পর্যন্ত হতে পারে। গাড়ি ব্যবহার করে হজে সহযোগিতা করলে সেই গাড়িও বাজেয়াপ্ত করার কথা জানিয়েছে সৌদি সরকার।
ভিজিট ভিসায় থাকা কোনো বিদেশি নাগরিক যদি হজ পালনের চেষ্টা করেন বা নির্ধারিত সময় অতিবাহিত করে সৌদি আরবে অবস্থান করেন, তাহলে তাকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা হবে এবং আগামী ১০ বছর সৌদি আরবে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
এই কঠোর নিয়ম ২৯ এপ্রিল (জিলকদ মাসের ১ তারিখ) থেকে শুরু হয়ে ১০ জুন (জিলহজ মাসের ১৪ তারিখ) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে কেউ হজ পারমিট ছাড়া মক্কায় প্রবেশ বা আশপাশের পবিত্র স্থানে অবস্থান করতে পারবে না। বিশেষ করে যারা ভিজিট ভিসায় সৌদি আরবে গেছেন, তাদের প্রতি নজরদারি থাকবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, হজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ইবাদত, যার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা আবশ্যক। সৌদি সরকারের নির্দেশনা মেনে চলা শুধু তাদের আইন মানার বিষয় নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থেও প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত এবং সেখান থেকেই দেশের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে। ফলে সৌদি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকার হজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই যারা নিয়ম লঙ্ঘন করে হজে অংশ নিতে চায় বা এ ধরনের তৎপরতায় অংশ নেয়, তাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
ধর্ম সচিব একেএম আফতাব হোসেন প্রামানিকও একই সুরে বলেন, হজ একটি দ্বিরাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড, যেখানে সৌদি আরব ও মুসলিম দেশগুলো যৌথভাবে কাজ করে থাকে। কিন্তু হজ সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখে সৌদি সরকার। তাই তাদের আইন-কানুন, বিধি-বিধান যথাযথভাবে মেনে চলা জরুরি।
তিনি জানান, হজ পরিচালনার জন্য সুপরিকল্পিত কর্মসূচি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং অংশীজনদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। তিনি বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানান, তারা যেন সৌদি সরকারের নির্দেশনা মেনে চলেন এবং অনুমোদন ছাড়া হজ পালনের চেষ্টা না করেন।
হজ ব্যবস্থাপনায় টিম স্পিরিট এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্বও তুলে ধরেন ধর্ম সচিব। তিনি বলেন, হজের পবিত্রতা রক্ষা এবং হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের হজকে একটি সফল আয়োজন হিসেবে দেখতে চায় এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি হজযাত্রীরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সৌদি সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারও অননুমোদিত হজ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব নিয়েছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশি নাগরিকদের উচিত সব নিয়ম ও বিধি মেনে হজে অংশ নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।








