বৃহস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৫৩ বছরের অনন্য নিদর্শন / প্রার্থনার সুরে মিলছে সম্প্রীতির বার্তা

ব্যুরো চীফ, বরিশাল 

৫৩ বছরের অনন্য নিদর্শন হিসেবে একই মাঠে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একপাশে আতরের সুঘ্রাণে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছেন, অন্যপাশে ধূপকাঠির ধোঁয়া আর ঢাক-ঢোলের শব্দে পূজা করছেন পুরোহিতরা। এভাবেই প্রার্থনার সুরে মিলছে সম্প্রীতির বার্তা।

দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজার জামে মসজিদ ও সার্বজনীন দুর্গা মন্দির থেকে।

সরেজমিন দেখা গেছে, একই মাঠের মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান। প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিরোধ তো দূরের কথা, স্থানীয় মুসলিমরা প্রতিবেশী হিন্দুদের পূজা উদযাপনে সহযোগিতা করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুই সম্প্রদায়ের আলাদা উপাসনালয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যে ৫৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দুর্গাপূজার সময় মন্দির থেকে ভেসে আসে ঢাকঢোল, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি। সন্ধ্যায় হয় আরতি। তবে মসজিদে আজান শুরু হলেই পূজারি ও ভক্তরা নীরবতা বজায় রাখেন। নামাজ শেষে আবার শুরু হয় পূজার্চনা।

মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, “মসজিদে আজান শুরু হলে আমরা পুরো অনুষ্ঠান বিরত রাখি। নামাজ শেষে আবার শুরু করি। আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানে কেউ কারও জন্য বিরক্তির কারণ হননি কখনো। বরং দুই ধর্মের অনুসারীরা আগলে রেখেছেন এই পবিত্র স্থান দুটি।”

স্থানীয় বাসিন্দা মাকসুদ মৃধা জানান, “এখানে সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করছেন। আমাদের পূর্বপুরুষরাও এমনটিই করেছেন। ছোটবেলা থেকেই আমরা পূজা দেখতে যাই মণ্ডপে। আবার ঈদ বা বিয়ের অনুষ্ঠানেও আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীরা আসেন।”

মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস বলেন, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গা মন্দির স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে একই মাঠে আধুনা জামে মসজিদ নির্মিত হয়। মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে থাকা সত্ত্বেও কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।

৫৩ বছর ধরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধন ধরে রেখেছে। সেই বন্ধন এখন ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে হিংসা-বিদ্বেষের কোনো চিহ্ন নেই।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শেনেরহাট বাজার দুর্গা মন্দির পরিদর্শনে এসে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান বলেন—
“বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে আর আমাকে মনোনয়ন দিলে, আমার ব্যক্তিগত অর্থায়নে এই সম্প্রীতির প্রতীক মসজিদ ও মন্দিরের উন্নয়নে যা কিছু প্রয়োজন আমি করব।”
তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় শুভেচ্ছা জানান এবং আগামী নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন।

আধুনা শেনের বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, “এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মসজিদে আজান হলেই হিন্দু ভাইয়েরা ঢাক-ঢোল বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষে আবার তাদের কার্যক্রম শুরু হয়। বছরের পর বছর সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন।”

গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহীম বলেন, “উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির থেকে সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। আমরা চাই, সমাজে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করুক।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ