সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বরিশালে টরকী-বাশাইলের মৃতপ্রায় খালে বিপন্ন জনপদ

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল

একসময়ের প্রবাহমান খরস্রোতা খাল আজ দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় নাব্যতা সংকট ও দখল-দূষণের কারণে মৃতপ্রায়। ফলে বিপন্ন হচ্ছে ওই খালের ওপর নির্ভরশীল কৃষিজমি, জীবন ও প্রকৃতি। খালটি খনন করে পুরনো যৌবনে ফিরিয়ে আনার জন্য ভুক্তভোগীরা অসংখ্যবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধর্না দিয়েও কোনো সুফল পাননি।

ঐতিহ্যবাহী এ খালটির অবস্থান বরিশালের আগৈলঝাড়া ও গৌরনদী উপজেলায়। এ দুই উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের মোহনা হচ্ছে গৌরনদীর পালরদী নদীর টরকী বন্দর সংলগ্ন স্ব-মিল এলাকায়। টরকী বন্দর থেকে শুরু করে ধানডোবা, রাজাপুর, সাদ্দাম বাজার, মোক্তার বাজার, চেঙ্গুটিয়া গ্রাম হয়ে খালটি বয়ে গেছে আগৈলঝাড়া উপজেলার বাশাইল বাজারের প্রধান খাল পর্যন্ত।

যেকারণে জনগুরুত্বপূর্ণ এ খালটি সবার কাছে টরকী-বাশাইল খাল নামে পরিচিত। এ খালের ওপর নির্ভরশীল ওইসব এলাকার হাজার হাজার কৃষক।

ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের আগৈলঝাড়া শাখার পরিবেশকর্মী সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল জানিয়েছেন—দীর্ঘদিন ধরে খাল খনন না করায় খাল ও নদীর নাব্যতা সংকটের ফলে খালের প্রধান মুখ পালরদী নদী থেকে খালে পানি প্রবেশের মোহনা উঁচু হয়ে গেছে। এখন আর খালে পানি প্রবেশ করছে না।

পাশাপাশি খালের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণ, খালের জায়গা দখল করে কাঁচা-পাকা স্থাপনা নির্মাণ এবং নির্বিচারে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে খরস্রোতা খালটি আজ বেহাল অবস্থায় পড়েছে। যার প্রভাব পড়ছে খালের পাশ্ববর্তী ফসলি জমিসহ জীবন ও প্রকৃতির ওপর।

তিনি আরও জানান, টরকী-বাশাইল খালটি একসময় এতদঞ্চলের প্রধান নৌপথ ছিল। কালের বিবর্তনে রাস্তা পাকা হওয়ায় সড়ক পথে যোগাযোগের জনপ্রিয়তা বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে খালটি সংস্কার করা হয়নি। যেকারণে খালটি ধীরে ধীরে নাব্যতা হারিয়েছে।

বিশেষ করে শীত মৌসুমে খালটি পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। বোরো মৌসুমে জনগুরুত্বপূর্ণ এ খালের পানি সেচের ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান আবাদ করা হয়। ওই সময়ে পালরদী নদীর মোহনায় সেচ পাম্প বসিয়ে খালে পানি উত্তোলন করায় চাষিদের বোরো আবাদে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল বলেন—টরকী-বাশাইল খালে মূলত আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদী থেকে পানি প্রবেশ করে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির স্তর নিচে নেমে গেলে খালে পানি প্রবেশ করে না।

এর স্থায়ী সমাধান হলো খাল খননের মাধ্যমে নদী ও খালের নাব্যতার সমন্বয় করা। কিন্তু সেটি না করে নদী ও খালের পানি প্রবেশের মুখে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম সেচ পাম্পের মাধ্যমে নদী থেকে খালে পানি তোলা হয়। ইজারার মাধ্যমে বিভিন্ন বোরো ব্লকের ম্যানেজারগণ সেচ প্রকল্প পরিচালনা করেন। যেকারণে সেচ প্রকল্পের এই পানি কয়েক হাত বদল হয়ে কৃষকদের উচ্চমূল্যে ক্রয় করতে হয়।

ফলে অধিকাংশ চাষি ধানচাষে আগ্রহ হারিয়ে বিকল্প হিসেবে বোরো জমিতে পান চাষ ও মাছের ঘের করেছেন। যে কারণে ক্রমেই কমে যাচ্ছে ধানচাষের জমির পরিমাণ। এছাড়াও খালের নাব্যতা সংকটের কারণে বর্ষা মৌসুমে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে খালগুলো পানিতে টইটুম্বুর হয়ে তলিয়ে যায় পানের বরজ ও মাছের ঘের।

অসংখ্য চাষি জানিয়েছেন—প্রতি ২০ শতক জমি চাষ করতে পানি সেচ বাবদ তিন শতক জমির ধান দিতে হয় ব্লক ম্যানেজারকে। বাজারে ধানের দামের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে জমি চাষাবাদ থেকে ফিরে আসছেন। ফলে প্রতিবছরই অনাবাদি জমির সংখ্যা বাড়ছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে—এ খালের ওপর নির্ভর করে অতীতে বিপুল সংখ্যক মৎস্যজীবী তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। এ খালে পাওয়া যেত শতাধিক প্রজাতির দেশি মাছ। স্রোতহীন খালটি আজ খননের অভাবে মরে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খালটি স্রোতহীন হয়ে পড়ায় বদ্ধ পানিতে জন্ম নিচ্ছে ম্যালেরিয়া, এডিস মশাসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগজীবাণু, যা এ অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ।

 

সাবেক ইউপি সদস্য ছাদের আলী সরদার বলেন—“আমাদের শৈশবে খালটিতে এমন স্রোত ছিল যে, আমরা সাঁতরে এপাড় থেকে ওপাড়ে যেতে পারতাম না। এ খাল থেকে মাছ ধরেই আমরা পরিবারের চাহিদা মেটাতাম। কিন্তু খালটি খননের অভাবে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়েছে। দেশীয় মাছ যেমন বিলুপ্ত হয়েছে, তেমনি পানির অভাবে হাজার হাজার কৃষক ধানচাষে আগ্রহ হারিয়েছেন। ফলে অনাবাদি জমির পরিমাণও বাড়ছে।”

তিনি আরও বলেন—জনগুরুত্বপূর্ণ এ খালটি খনন করে পুরনো যৌবনে ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে উপজেলা কৃষি অফিস ও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অসংখ্যবার ধর্না দিয়েও কোনো সুফল মেলেনি। গতবছর বোরো মৌসুমের পূর্বে ভুক্তভোগী কৃষকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বরাবর খালটি খননের জন্য আবেদন করা হলেও অদ্যাবধি কোনো সাড়া মেলেনি।

কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলা হচ্ছে—প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কবে নাগাদ জনগুরুত্বপূর্ণ এ খাল খননের প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না কেউ।

কৃষিনির্ভর এ জনপদের প্রান্তিক চাষি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ জনগুরুত্বপূর্ণ খালটিকে দখল ও দূষণমুক্ত করে জরুরি ভিত্তিতে খননের মাধ্যমে নাব্যতা সংকট দূর করে পানি প্রবাহ নিশ্চিতের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ ব্যাপারে বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন—“আমরা ফসল উৎপাদনে ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহার করে থাকি। শীতকালে যখন বোরো ধান লাগানো হয়, তখন সেচকাজে প্রচুর পানি প্রয়োজন হয়। কারণ বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর ফসল। তাছাড়া অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও বৃষ্টিপাত কম হলে সেচের প্রয়োজন হয়। ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারে সেচ খরচ কম হয়। সেজন্য যদি আমরা নদী বা খালের পানি সংরক্ষণ করে সম্পূরক সেচকাজে ব্যবহার করতে পারি, তবে অল্প খরচে অধিক ফসল ফলানো সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন—“সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের উপায় হচ্ছে খাল ও নদী খনন। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানির প্রবাহ কমে গেছে; অনেক খাল দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে খাল এবং নদীগুলো পুনরায় খনন করা হলে কৃষকরা দুই দিক থেকেই লাভবান হবেন। এতে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা নিরসনের মাধ্যমে পতিত জমি পুনরায় চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে, অপরদিকে শুকনো মৌসুমে খালের জমাটবদ্ধ পানি সেচকাজে ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে।”

জেলা প্রশাসক আরও বলেন—“বরিশালের অনেকগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ খাল খননের বিষয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আশা করছি খুব শিগগিরই এসব খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ