বৃহস্পতিবার, ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আমতলীতে ৪০ বছর পর ইউনিয়ন পরিষদ ফিরলো জনগণের দোরগোড়ায়

বরগুনা প্রতিনিধি

বরগুনার আমতলীতে ঘটেছে এক নীরব প্রশাসনিক বিপ্লব। প্রায় চার দশক ধরে উপজেলা শহরের ভাড়া অফিসে সীমাবদ্ধ থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কার্যক্রম অবশেষে ফিরে গেছে নিজ নিজ ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবনে। এর পেছনে রয়েছেন সদ্য যোগ দেওয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ্জামান খান, যার ‘অফিসে নয়, জনগণের দোরগোড়ায়’ এই ভাবনা ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

আমতলী উপজেলার আয়তন প্রায় ৩৯৯ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা সোয়া দুই লাখ। রয়েছে ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা। ১৯৮০–এর দশকের শুরুতে নানা অজুহাতে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসগুলো উপজেলা শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেই থেকে দীর্ঘ ২৫ থেকে ৪০ বছর ধরে ইউনিয়নবাসীকে সামান্য সেবা পেতেও উপজেলা শহরে আসতে হতো।

দক্ষিণে হলদিয়া ও উত্তরে আঠারগাছিয়া ইউনিয়ন উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫–২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কাঁচা রাস্তা ও দুর্বহ যাতায়াতের কারণে একটি প্রত্যয়নপত্র বা নাগরিক সনদ নিতে ব্যয় হতো ১০০ থেকে ২৫০ টাকা, নষ্ট হতো পুরো একটি দিন।

ধুলোতে ঢেকে ছিল ভবন, এবার প্রাণ ফিরে পেল ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জন্য সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনগুলো বছরের পর বছর তালাবদ্ধ পড়ে ছিল। দেয়াল থেকে রং উঠে গেছে, জানালায় জং ধরেছে, চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড়। ইউএনও রোকনুজ্জামান খানের উদ্যোগে সেই সব ভবন আবার সচল হয়েছে। এখন সাতটি ইউনিয়ন পরিষদেই নিয়মিতভাবে জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকছেন এবং স্থানীয়দের সেবা প্রদান করছেন।

চলতি বছরের ১৩ মে আমতলীতে ইউএনও হিসেবে যোগদানের পর মো. রোকনুজ্জামান খান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এরপর ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও কর্মকর্তাদের ডেকে স্পষ্টভাবে জানান—নিজস্ব ইউনিয়নে কার্যক্রম ফিরিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। পরবর্তীতে পত্র প্রদান, সরেজমিন পরিদর্শন এবং কঠোর নির্দেশনার পর জুনের মাঝামাঝি সময়ে বন্ধ থাকা সব ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের তালা খুলে দেওয়া হয়।

আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য নাজমুন নাহার মুকুল বেগম বলেন, ৪০ বছর পর ইউনিয়ন পরিষদ আবার ইউনিয়নে ফিরেছে। ইউএনও স্যারের নির্দেশেই এটি সম্ভব হয়েছে। এখন সেবাগ্রহীতাদের পাশাপাশি আমাদেরও আর উপজেলায় যেতে হয় না।

কুকুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন আহমেদ মাসুম তালুকদার এবং আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রিপন বলেন, এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। ইউনিয়ন পরিষদ আবার মানুষের কাছে ফিরে এসেছে, সেবা ফিরেছে জনগণের দোরগোড়ায়।

হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামের মোয়াজ্জেম হোসেন হাওলাদার বলেন, আগে পরিচয়পত্র নিতে উপজেলা শহরে যেতে হতো। এখন ইউনিয়ন পরিষদেই কাজ হয়। এতে সময় ও খরচ—দুটোই বেঁচে যাচ্ছে।

গুলিশাখালী ইউনিয়নের ডালাচারা গ্রামের গৃহবধূ সালমা বেগম বলেন, আগে জন্মনিবন্ধন করতে আমতলী যাওয়া লাগত। এখন ইউনিয়ন পরিষদেই সব কাজ হয়। এজন্য আমরা ইউএনও স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ।

জমে উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন বাজারগুলো ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সংলগ্ন বাজারগুলোতে ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল। অনেক ব্যবসায়ী দোকান গুটিয়ে চলে গিয়েছিলেন। এখন পরিষদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় সেই বাজারগুলোতে আবারও প্রাণ ফিরে এসেছে।

হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সসংলগ্ন বাজারের চা বিক্রেতা সোলায়মান মাতবর বলেন, আগে সন্ধ্যার পর বাজার ফাঁকা থাকত। এখন ইউনিয়ন পরিষদ খোলায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লোকজনের ভিড় থাকে, ব্যবসা ভালো চলছে।

আমতলীর শিক্ষক আব্দুল হাই বলেন, বিগত ৪০ বছরে যা কেউ পারেনি, নতুন ইউএনও স্যার তা করে দেখিয়েছেন। তিনি এক নির্দেশে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কার্যক্রম ইউনিয়নে ফিরিয়ে এনে সাধারণ মানুষের পদচারণায় প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ইউএনও মো. রোকনুজ্জামান খান বলেন, সরকারি বিধি মেনে কাজ করলেই সেবা সহজলভ্য হয়। অনেক তরুণ তাদের ইউনিয়নে ইউনিয়ন পরিষদ দেখেনি, অথচ এটি তাদের অধিকার। এখন জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ কার্যালয়ে ফিরে গেছেন, ফলে সেবাগ্রহীতাদের আর শহরে আসতে হবে না।

চল্লিশ বছরের প্রথা ভেঙে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কার্যক্রম নিজ নিজ এলাকায় ফিরিয়ে এনে ইউএনও রোকনুজ্জামান খান আমতলীতে এক নতুন প্রশাসনিক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। এতে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের সেবা এখন সত্যিকার অর্থেই পৌঁছে গেছে দোরগোড়ায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ