পথে প্রান্তরে ডিজিটাল ডেস্ক:
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ঘাঁটিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত অত্যাধুনিক অস্ত্রের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার গভীর জঙ্গলে গড়ে উঠেছে কেএনএফের শক্তিশালী ঘাঁটি। এসব ঘাঁটিতে একে-৪৭ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, গ্রেনেড, রকেট লঞ্চার, নাইট ভিশন ডিভাইসসহ বিভিন্ন ধরণের সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তা সূত্র জানায়, জোরপূর্বক এলাকার কিশোর ও তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এসব ঘাঁটিতে। সেখানে তাদের দেওয়া হচ্ছে কঠোর কমব্যাট ট্রেনিং। প্রশিক্ষণ শেষে জলপাই রঙের ছাপা পোশাক, ক্যাপ, বুট জুতা পরিয়ে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর মতো কাঠামোতে পদবি দেওয়া হয়—ক্যাপ্টেন, মেজর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল। ঘাঁটির সর্বোচ্চ পদটি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রুমা থানা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে ‘কুত্তাঝিরি’ নামক স্থানে রয়েছে কেএনএফের একটি বড় ট্রেনিং ক্যাম্প। গত বছরের নভেম্বর মাসে এই ঘাঁটিতে অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে।
চলতি বছরের ২ জুলাই মাসে উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের পলতাই পাহাড়ের পাদদেশে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। অভিযানে দুই কেএনএ সদস্য নিহত হয়। উদ্ধার করা হয় দুটি একে-৪৭ (স্টিলবাট ভার্সন), একটি চাইনিজ রাইফেল, বিপুল পরিমাণ গুলি ও কার্তুজ। উল্লেখযোগ্য যে, উদ্ধার হওয়া চাইনিজ রাইফেলটি পুলিশের অস্ত্র, যা ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল রুমায় সোনালী ব্যাংকে কেএনএফের হামলার সময় লুট করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া স্টিলবাট ভার্সনের একে-৪৭ রাইফেল ও স্নাইপার গুলির ধরণ প্রমাণ করে—এই অস্ত্রগুলো মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনীর ঘাঁটি থেকে এসেছে। এই ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বাংলাদেশের কোনো বাহিনীর হাতে নেই, এমনকি এর ম্যাগাজিনও ফাইবারের তৈরি। ধারণা করা হচ্ছে, কেএনএফ এই অস্ত্র সংগ্রহ করেছে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির সঙ্গে চুক্তি বা বিনিময়ের মাধ্যমে।
সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে কেএনএফ ধীরে ধীরে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। তাদের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে এম-১৬, এম-২২, একে-৪৭, চায়নিজ রাইফেল, স্নাইপার, আরপিজি, গ্রেনেড, লাইট মেশিনগান, কমিউনিকেশন ডিভাইস ও নাইট ভিশন প্রযুক্তিসম্পন্ন সরঞ্জাম। এসব অস্ত্রের অধিকাংশ এসেছে মিয়ানমারের চিন (শিন), রাখাইন, কাচিন ও সাগাইং অঞ্চলের সামরিক জান্তার অস্ত্রাগার থেকে। এই অঞ্চলে সংঘাতের সময় আরাকান আর্মি ও কুকি-চিন বাহিনী যৌথভাবে সেনাঘাঁটি দখল করে এবং অস্ত্র হাতবদল হয়।
জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলাকে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করছে কেএনএফ। মিজোরাম সীমান্ত থেকে অস্ত্র এনে এখানে জমা করে পরে তা রুমা ও থানচিতে পাঠানো হয়। রাতের আঁধারে হেঁটে কিংবা মোটরসাইকেলযোগে এই অস্ত্রচালান পৌঁছে যায় কেএনএফের পাহাড়ি ঘাঁটিতে।
থানচি উপজেলায় ডিম পাহাড়, রেমাক্রি, তিন্দুর বাজার, ছোট মোদক, বড় মোদকসহ বহু দুর্গম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো উপস্থিতি নেই। এই এলাকাগুলোতে কেএনএফ ও আরাকান আর্মির যৌথভাবে গড়ে তোলা অস্ত্রঘাঁটি রয়েছে। আর এই রুটেই থানচি থেকে নীলগিরি, চিম্বুক, ওয়াই জংশন হয়ে অস্ত্র রুমার ঘাঁটিতে চলে আসে।
বর্তমানে বান্দরবান জেলার নয়টি উপজেলা—বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, থানচি, রুমা, লামা, আলীকদম এবং রাঙামাটির জুরাছড়ি, বরকল ও বিলাইছড়িতে কেএনএফের অস্তিত্ব রয়েছে। টানা অভিযানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী বহু ঘাঁটি উচ্ছেদ করলেও পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল ও স্থানীয় কিছু সহযোগীর সহায়তায় সংগঠনটি অস্ত্র মজুদ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, কেএনএফের অস্ত্র সংগ্রহের উৎস ও মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অস্ত্র কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, স্থানীয় সহযোগীদের চিহ্নিতকরণ এবং যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।








