রুবেল ভূঁইয়া, পথে প্রান্তরে:
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা এক অতিকায় স্মৃতিচিহ্ন—দালাল বাজার জমিদার বাড়ি। একসময় রাজকীয় প্রাসাদের মতো ছিল যে বাড়িটি, আজ তা পড়ে আছে পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ হিসেবে। তার গায়ে লেগে আছে ইতিহাসের ধুলোমাটি, ঐশ্বর্যের ক্ষয়চিহ্ন।
এই জমিদার বাড়ির ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় আড়াইশ বছর আগে, যখন কলকাতা থেকে তৎকালীন নোয়াখালী পরগণার লক্ষ্মীপুর মৌজায় কাপড়ের ব্যবসা করতে আসেন ব্যবসায়ী লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণব। স্থানীয় লোকজন তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক দালাল হিসেবে চিহ্নিত করতেন তাদের, আর সেখান থেকেই এই বাড়িটির নাম হয় “দালাল বাজার জমিদার বাড়ি”।
লক্ষ্মী নারায়ণের ছেলে ব্রজবল্লভ পিতার ব্যবসা আরও প্রসারিত করেন, আর তার পুত্র গৌরকিশোর কলকাতায় পড়াশোনার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি জমিদারি খরিদ করেন এবং বিশাল রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন লক্ষ্মীপুরের মাটিতে। পাঁচ একর জায়গাজুড়ে তৈরি হয় রাজগেট, অন্দরমহল, শানবাঁধানো ঘাট, পুকুর, নাটমন্দির, পূজামণ্ডপসহ নানা স্থাপনা।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে তিনি “রাজা” উপাধি পান বলে জানিয়েছেন গবেষক শ্রী সুরেশ চন্দ্রনাথ মুজমদার তার “রাজপুরুষ যোগীবংশ” নামক গ্রন্থে। তার পূর্বপুরুষরা ১৬২৯ থেকে ১৬৫৮ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে এসে বসতি গড়েন।
গৌরকিশোর রায় চৌধুরী ও তার স্ত্রী লক্ষ্মী প্রিয়া ছিলেন নিঃসন্তান। ফলে ঢাকার বিক্রমপুর থেকে গোবিন্দকিশোর নামে এক পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেন তারা। গোবিন্দকিশোর এবং পরে তার পুত্র নলিনী কিশোর রায় জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নলিনী কিশোর খাজনা আদায় ও জমিদারির সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
জানা গেছে, এই বাড়ির নির্মাণকাজে ব্যবহার হয়েছিল বিশাল লোহার ভীম। বাড়ির অন্দরমহলে ছিল নৃত্যশালা, নাটমন্দির—যেখানে বসতো জমিদার পরিবারের রঙ্গতামাশা আর পূজার আয়োজন। আজ সেখানে কেবল নীরবতা আর ধ্বংসের আর্তনাদ। জমিদারি আসন ও নৃত্যমঞ্চ চুরি হয়ে গেছে বহু আগেই। দেশভাগের সময় জমিদার পরিবার ভারতে চলে যায়; জনরোষ এবং ব্রিটিশ ঘনিষ্ঠতার কারণে তারা টিকতে পারেননি নিজভূমে।

এ জমিদারবাড়ির অবদান আজও লক্ষ্মীপুরবাসীর স্মৃতিতে রয়ে গেছে। প্রায় ২২ একর জমির ওপর খনন করা হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘খোয়া সাগর দিঘী’। এর উত্তর পাশে আছে জমিদারদের তৈরি মঠ, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মঠবাড়ি’ নামে। এছাড়া জমিদার পরিবারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় দালাল বাজার এন.কে. উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুর মন্দির এবং একটি দাতব্য চিকিৎসালয়।
এই বাড়ির সঙ্গে একটি মতও চালু রয়েছে—লক্ষ্মী নারায়ণ বা তার পুত্রবধূ লক্ষ্মী প্রিয়ার নাম থেকেই নাকি ‘লক্ষ্মীপুর’ নামের উৎপত্তি। যদিও ইতিহাসবিদদের একাংশ এই মতকে ভিত্তিহীন বলে মনে করেন।
আজ এই জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব হুমকির মুখে। রাজকীয় গরিমা হারিয়ে এখন এটি শূন্যতায় বিলীন হতে বসেছে। জমিদারদের নিরাপত্তায় মোতায়েন অন্দরমহল আজ উন্মুক্ত ধ্বংসস্তূপ। শানবাঁধানো ঘাটে আর নামে না রাণীর পা, নাটমন্দিরে হয় না আর কোনো নৃত্য। সব মিলিয়ে দালাল বাজার জমিদার বাড়িটি আজ কেবলই ইতিহাসের সাক্ষী।
লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে সিএনজি বা বাসে দালাল বাজার পৌঁছাতে ভাড়া পড়ে মাত্র ২০ টাকা। বাজার থেকে ১৫০ গজ পূর্বে ঢাকা-রায়পুর মহাসড়কের উত্তর পাশে রয়েছে খোয়া সাগর দীঘি। দীঘির বিপরীত পাশে রয়েছে মঠবাড়ি। এখান থেকে দালাল বাজার ডিগ্রি কলেজের পেছন দিয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় জমিদার বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোতে।
ইতিহাসের সাক্ষী এই জমিদার বাড়িটি হয়তো আর বেশি দিন টিকবে না। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজপ্রাসাদ একদিন হয়তো পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। ইতিহাসে হারিয়ে যাবে গৌরবময় এক অধ্যায়।








