সুনীল দাস, খুলনা
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১২টি পূজা মন্দির। জলাবদ্ধতার কারণে প্লাবিত হওয়ায় কৃষ্ণনগর গ্রামের সার্বজনীন হরিগুরু মন্দির ও মুজারঘুটা গ্রামের পূর্বপাড়া, বৈরাগীবাড়ি-সহ ৩টি মন্দিরে এবার বন্ধ রয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি ৮টি মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়ায় এসব পানিবন্দি পূজা মন্দিরে ডিঙি নৌকা ও ডোঙায় চড়ে প্রতিমা দর্শনে যাচ্ছেন ভক্ত ও পূজারীরা। এদিকে পানি নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরগুলোতে বাড়তি অনুদান দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ৬টি ইউনিয়নে বছরের প্রায় ৬ মাসই জলাবদ্ধতায় পানিতে নিমজ্জিত থাকে। চলতি বছরও টানা বৃষ্টির কারণে উপজেলার রংপুর ও রঘুনাথপুর ইউনিয়নে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কৃষ্ণনগর, মুজারঘুটা, বারানসি ও বটভেড়া গ্রামে জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করে। ফলে এ সব গ্রামের সকল রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমির পাশাপাশি ১২টি মন্দির এখন পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ার কারণে এবার কৃষ্ণনগর গ্রামের হরিগুরু মন্দির, মুজারঘুটা পূর্বপাড়া, মধ্যপাড়া বৈরাগীবাড়ি ও পশ্চিমপাড়ার ৩টি মন্দিরে দুর্গাপূজা বন্ধ রয়েছে। এতে চরম হতাশ এলাকার সনাতনী সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ।
রংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সমরেশ মণ্ডল জানান, এ বছর উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়নে ২১২টি সার্বজনীন পূজা মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ধামালিয়া ইউনিয়নে ৯টি, রঘুনাথপুরে ২১টি, রুদাঘরায় ১২টি, খর্ণিয়ায় ১৫টি, আটলিয়ায় ২৫টি, মাগুরাঘোনায় ৮টি, শোভনায় ১৭টি, শরাফপুরে ১২টি, সাহসে ৭টি, ভান্ডারপাড়ায় ১৪টি, ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নে ১২টি, রংপুরে ২৬টি, গুটুদিয়ায় ১৭টি ও মাগুরখালী ইউনিয়নে ১৭টি মন্দিরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। পানিবন্দি ৮টি মন্দিরের মধ্যে ৫টি কৃষ্ণনগর, ২টি মুজারঘুটা ও একটি বারানসি গ্রামে। কৃষ্ণনগর গ্রামের ১টি ও মুজারঘুটা গ্রামে ৩টি মন্দিরে এবার পূজা হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, এই ভয়াবহ জলাবদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাপূজার মন্দির পানিবন্দি থাকার পরও ৮টি মন্দিরে পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু রাস্তাঘাট সবই প্লাবিত হওয়ায় ভক্তরা সেখানে ডিঙি নৌকায় চড়ে প্রতিমা দর্শনে যাচ্ছেন। এটা এলাকাবাসীর জন্য একটি বেদনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচতে ও সুষ্ঠুভাবে পূজা অনুষ্ঠানে সাময়িক কোনো ব্যবস্থা নয়, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভরাট হওয়া নদী ও খাল খনন করে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতার সমাধান চান তারা।
এদিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, জলাবদ্ধতার কারণে পানি পচে দুর্গন্ধ হচ্ছে, ঘরবাড়িতে বিষাক্ত সাপের আনাগোনা। এ কারণে ডিঙি নৌকা ছাড়া পূজা মন্দিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে কৃষ্ণনগর সার্বজনীন হরি মন্দির চত্বর পানিতে তলিয়ে আছে। সেখানে দেড় থেকে দুই ফুট পানি। কচুরিপানা আটকে থাকায় মনে হবে এটা কোনো এক জলাশয়। শুধু তাই নয়, মন্দির চত্বরে বেশ কিছু ডিঙি নৌকা রাখা আছে। দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এটা মন্দির প্রাঙ্গণ। সেখানে খাল-বিলের সঙ্গে মন্দির একাকার হয়ে পড়েছে।
একই রকম অবস্থা মুজারঘুটা পূর্বপাড়া মন্দিরেও। সেখানেও মন্দিরের মধ্যে হাঁটু সমান জল। আশপাশের এলাকাও জলাবদ্ধ। যাতায়াতের সকল রাস্তাই জলমগ্ন। এমনকি মন্দিরে প্রতিমা তৈরি করে পূজার কোনো সুযোগই নেই। মন্দিরের পাশের বাড়ির অমল হালদারের স্ত্রী সবিতা হালদার জানান, তারা নিয়মিতভাবেই এই মন্দিরে পূজা করে থাকেন। কিন্তু গত দুই বছর সেখানে পূজা করতে পারছেন না জলাবদ্ধতার কারণে। মন্দিরের পুরোটাই জলমগ্ন হয়ে যাওয়ায় তারা সেখানে যেতেও পারছেন না, পূজাও করতে পারছেন না। কতদিনে এ সমস্যার সমাধান হবে সেটাও তারা বুঝতে পারছেন না।
একই গ্রামের আনন্দ মণ্ডল বলেন, ডাকাতিয়া বিলের মধ্যে কৃষ্ণনগর গ্রাম ও মুজারঘুটা গ্রাম। এ গ্রামে যাতায়াতের জন্য প্রায় ৫ কিলোমিটার একটি রাস্তা আছে। সেটিও পানিতে নিমজ্জিত। এছাড়া গ্রামের সবগুলো রাস্তা হাঁটু সমান জলে ডুবে থাকায় সেখানে দিয়ে চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে এলাকার মানুষ ডিঙি নৌকা ও ডোঙায় চলাচল করছেন বাধ্য হয়ে।
কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দা সুভাষ মণ্ডল জানান, মন্দির চত্বরে প্রায় কোমর পানি উঠেছিল। পানি নামতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ৮-১০ ইঞ্চি পানি কমেছে। মাত্র এক ইঞ্চি পানি কমতে ৬-৭ দিন সময় লেগে যাচ্ছে। এখনো অনেক পানি। এ কারণে হরি মন্দিরে এবার দুর্গাপূজা হচ্ছে না। এলাকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে দ্রুতই উদ্যোগ নেবে সরকার—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর।
রঘুনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান মনোজিত কুমার বালা জানান, আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে রঘুনাথপুর ও রংপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট পানিবন্দি হয়ে আছে। পূজায় ভক্তদের অঞ্জলি দেওয়ারও সুযোগ নেই। বাড়তি অনুদানের টাকা দিয়ে মন্দির চত্বরে বালি দিয়ে উঁচু করতে পারলে ভক্তদের দাঁড়ানোর সুযোগ হবে এবং মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
খুলনা জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান জানান, ডুমুরিয়া, ফুলতলার বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলগুলোতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা রয়েছে। এই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমে এরই মধ্যে খাল-নদীর প্রতিবন্ধকতা পরিষ্কার ও খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে। মধ্যমেয়াদির একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে শুধু খুলনাই নয়, আশপাশের অঞ্চলের নদী খনন করে জলাবদ্ধতা দূর করার কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, পানিবন্দি মন্দিরগুলোর জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১২ মেট্রিক টন চাল অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও অনুদানের ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের কয়েকটি বিভাগের সমন্বয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য কাজ চলছে, দ্রুতই একটি স্থায়ী সমাধানের পথ বের করা সম্ভব হবে বলেও তিনি জানান।








