দিব্যতনু দাস, বাগেরহাট
বাগেরহাটে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত সাংবাদিক ও বিএনপি নেতা হায়াত উদ্দিনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার (৪ অক্টোবর) রাতে শহরের হাড়িখালি নিজ বাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে হাড়িখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এটিএম আকরাম হোসেন, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তরফদার রবিউল ইসলামসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
শুক্রবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শহরের হাড়িখালি এলাকায় দৈনিক ভোরের চেতনা পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক এস. এম. হায়াত উদ্দিন (৪০)–কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন একই এলাকার মো. ইসরাইল মোল্লা ও তার সহযোগীরা। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার বিকেলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
নিহত হায়াত উদ্দিন শহরের হাড়িখালি এলাকার মৃত নিজাম উদ্দিনের ছেলে। সম্প্রতি তিনি বাগেরহাট পৌর বিএনপির সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলেন, তবে নির্বাচনে পরাজিত হন। এর আগে তিনি পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। হায়াত উদ্দিনের এক স্ত্রী ও দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে—বড় মেয়ে হিয়া মনি (৮) এবং ছোট মেয়ে মারজিয়া (১)। শিশুরা এখনও বুঝতে পারছে না, তাদের বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না। স্ত্রী ফাতেমা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন এবং স্বামীর হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি করছেন।
ফাতেমা বেগম বলেন, “শুধু সত্য কথা লেখার কারণেই আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী নারী বলেন, “হাড়িখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন মোড়ে একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন হায়াত উদ্দিন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দুটি মোটরসাইকেলে করে এসে চার–পাঁচজন যুবক অতর্কিতে তার ওপর হামলা চালায়। তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায়।”
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মাদক ব্যবসা, ঠিকাদারি কাজের মান, রাজনৈতিক দুর্নীতি প্রভৃতি বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ছিলেন হায়াত উদ্দিন। কয়েক মাস আগেও তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
হায়াত উদ্দিনের মা হাসিনা বেগম বলেন, “কয়েকদিন আগে সন্ত্রাসীরা বাড়িতে এসে আমার ছেলেকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়। তখন আমার ছেলে মামলা করেছিল, কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখন আমাদের বিচার চাওয়ার জায়গা নেই, তাই আল্লাহর কাছেই বিচার দিয়েছি।”
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “হত্যার সঙ্গে জড়িতদের আমরা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে মামলা রুজু করা হবে।”
প্রধান অভিযুক্ত মো. ইসরাইল মোল্লা হাড়িখালি এলাকার মো. আব্দুস ছালাম মোল্লার ছেলে। তিনি বিএনপির কর্মী এবং ‘ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হেলথ কেয়ার সোসাইটি’র বাগেরহাট জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, সাংবাদিক ও বিএনপি নেতা এস. এম. হায়াত উদ্দিনের হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাগেরহাট প্রেসক্লাব। দুপুরে প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে শতাধিক গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক তরফদার রবিউল ইসলাম, টেলিভিশন জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হক, সাংবাদিক এস. এম. রাজ, আহাদ উদ্দিন হায়দার, হেদায়েত হোসেন লিটন, ইয়ামিন আলী, এইচ. এম. মইনুল ইসলাম, মোল্লা আব্দুর রব, এস. এস. শোহান, মিরনুজ্জামান, এস. এস. সাগর, কামরুজ্জামান শিমুল প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, প্রকাশ্যে একজন সংবাদকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, অথচ পুলিশ এখনও কাউকে আটক করতে পারেনি। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার না করা হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এ সময় সংবাদকর্মীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মানববন্ধনে যোগ দেন বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম. এ. সালাম, যুগ্ম আহ্বায়ক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার জাকির হোসেন, খান মনিরুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানা, ফকির তারিকুল ইসলাম, শাহেদ আলী রবি, মাহবুবুর রহমান টুটুলসহ জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
তারা বলেন, “হায়াত উদ্দিন শুধু সাংবাদিকই ছিলেন না, তিনি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একজন সৈনিক ছিলেন। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। হত্যাকারী যত শক্তিশালীই হোক, তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।”








