দিব্যতনু দাস, বাগেরহাট
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের রোমজাইপুর গ্রামের তিন পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আন্তর্জাতিক নৌপথ মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল। কয়েক বছর ধরে ভাঙনে ইতোমধ্যে রোমজাইপুর গ্রামের শতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নতুন করে আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। এবারের ভাঙনে ফসলি জমিসহ পেড়িখালি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রোমজাইপুর সড়কের বিভিন্ন স্থান ধসে গেছে। সেই সঙ্গে এই গ্রামে রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট, নেই কোনো আশ্রয়কেন্দ্র। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হয় নিজ বাড়িতে। গ্রামে থাকা একমাত্র ইটের সড়কেরও কয়েক জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এদিকে বুধবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সুপেয় পানির তীব্র সংকট নিরসন ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে করণীয় বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও বাঁধন মানব উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে রামপাল উপজেলার দাউদখালী নদীর তীরে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানিতে রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তামান্না ফেরদৌসি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিরাজ মোল্লা, জেলা জামায়াতে ইসলামী নায়েবে আমির অ্যাড. আব্দুল ওয়াদুদ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাফিজুর রহমান তুহিন, বাঁধন মানব উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এএসএম মঞ্জুরুল হাসান মিলন, প্রজেক্ট ম্যানেজার সোহাগ হাওলাদার, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ইনস্পিরেটর নাহিদা ইসলাম তৃষাসহ রোমজাইপুর গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে নদীগর্ভে বাড়িঘর ও ফসলি জমি বিলীন হওয়ার বর্ণনা দেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তারা জানান, অনেক জমি ও বাড়ি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বেড়িবাঁধ না দিলে যেকোনো সময় তা বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে সুপেয় পানির সংকট ও আশ্রয়কেন্দ্র না থাকার দুর্ভোগের কথাও উঠে আসে তাদের বক্তব্যে।
রোমজাইপুর গ্রামের বাসিন্দা হেনা বেগম রিনা বলেন, “আমার বাড়ির অর্ধেক নদীগর্ভে চলে গেছে। বাথরুম ভেঙে পড়েছে। বসতঘরের মধ্যে ফাটল ধরেছে। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।”
হাশেম শেখ বলেন, “আজকেও নদীর পাড় ভেঙে পড়েছে। আমাদের ঘরবাড়ি আর ফসলি জমি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এখন মালামাল আর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব, তার ঠিক নেই। টেকসই বাঁধ দিলে আমাদের গ্রাম থাকবে, না হলে পদ্মার ভাঙনের মতো বিলীন হয়ে যাবে।”
রোজিনা বেগম বলেন, “নদীভাঙনে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। ভাঙতে ভাঙতে আমাদের ভিটেমাটি হারাতে বসেছি। ঘরের চারদিকে ভাঙন ধরেছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যেই নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।”
আবজাল আলী নামের এক বৃদ্ধ বলেন, “উপকূলীয় এই অঞ্চলে লবণাক্ত পানির সমস্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। আমাদের গ্রামে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট রয়েছে। এখানকার মানুষকে বাঁচাতে হলে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রায়ই আমাদের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু এখানে কোনো সাইক্লোন সেন্টার নেই। ফলে ঝড়-বন্যার সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই থাকতে হয়।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিরাজ মোল্লা বলেন, “রোমজাইপুর গ্রামটি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা এলাকাটি পরিদর্শন করেছি। পুরো বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অনুমতি পেলে এখানে বাঁধ দেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করা হবে।”
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, “এখানে আমরা পুকুর খননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছি। তাছাড়া প্রতিটি পরিবারে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে পানির সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।”
রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না ফেরদৌসি বলেন, “রোমজাইপুর গ্রাম রক্ষায় ছোটখাটো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে এই গ্রামের সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বড় প্রকল্প প্রয়োজন। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।”








