বৃহস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিভিন্ন দলের নেতা ও ডিসি-এসপি মিলেমিশে পাথর লুট

অনলাইন ডেস্ক:

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনীতির মাঠ অনেকটাই নিরব। আওয়ামী লীগ নেতারাও আত্মগোপনে। তবে বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও এনসিপি—সব দলের নেতারা একসঙ্গে যুক্ত হয়েছেন পাথর লুটে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং বিজিবির কিছু সদস্যও এ চক্রে জড়িত। এমনকি পুলিশের এসআই ও কনস্টেবলরাও নিয়মিত টাকা পেতেন। সব মিলিয়ে প্রশাসনের পকেটে গেছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা।

সিলেটের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা সবসময় পাথর উত্তোলনের পক্ষে সক্রিয় থেকেছেন। গত পাঁচ বছরে তারা নানা উপায়ে কোয়ারি ইজারা চালুর চেষ্টা করলেও সরকার অনুমতি দেয়নি। গত ২৭ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ৫১টির মধ্যে ১৭টি কোয়ারির ইজারা স্থগিত করে, যার মধ্যে ৮টি সিলেটের। তবে সংরক্ষিত এলাকা ও পর্যটনকেন্দ্রের পাথর লুট বন্ধ করা যায়নি। গত ২৪ জুন সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে জেলা পাথর মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি পাথর লুটকে আরও উৎসাহিত করেছে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য

বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও এনসিপির অন্তত ৩১ নেতার নাম এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
বিএনপির মধ্যে রয়েছেন—সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিন, পাথর ব্যবসায়ী হাজি কামাল, সাবেক শ্রমিক দল নেতা লাল মিয়া, যুবদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন দুদু, জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রুবেল আহমেদ বাহার, মুসতাকিন আহমদ ফরহাদ, মো. দুলাল মিয়া দুলা, রজন মিয়া, জসিম উদ্দিন, সাজন মিয়া, জাকির হোসেন, মোজাফর আলী, মানিক মিয়া, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মকসুদ আহমদ, যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ওরফে শাহপরান, বহিষ্কৃত কোষাধ্যক্ষ শাহ আলম ওরফে স্বপন, আবুল কাশেম ও পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমজাদ বক্স।

আওয়ামী লীগের মধ্যে রয়েছেন—কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল ওদুদ আলফু, কর্মী বিলাল মিয়া, শাহাবুদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, মনির মিয়া, হাবিল মিয়া ও সাইদুর রহমান।

জামায়াতের মধ্যে রয়েছেন—সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মো. ফখরুল ইসলাম, সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন, সাবেক উপজেলা আমির আজমান আলী ও জামায়াত নেতা মাস্টার শফিকুর।

এনসিপির মধ্যে রয়েছেন—সিলেট জেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন ও মহানগর প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।

এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী ১১ জনের নামও এসেছে, যাদের মধ্যে আছেন আনর আলী, উসমান খাঁ, ইকবাল হোসেন আরিফ, দেলোয়ার হোসেন জীবন, আরজান মিয়া, মো. জাকির, আলী আকবর, আলী আব্বাস, মো. জুয়েল, আলমগীর আলম ও মুকাররিম আহমেদ।

লুটের অঙ্ক

পরিবেশবাদীদের দাবি, অন্তত ৪ কোটি ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে। প্রতি ট্রাকে ৫০০ ঘনফুট হিসেবে ৮০ হাজার ট্রাক দিয়ে এ পাথর সরানো হয়। ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার টাকা কমিশন হিসেবে প্রশাসনের পকেটে গেছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসি, এসপি, ওসি, থানা পুলিশ, ডিবি, ইউএনও, এসিল্যান্ড, এমনকি তহশিলদার পর্যন্ত ভাগ পেয়েছেন।

লুট করা পাথর প্রতি ঘনফুট ১৮২ টাকা দরে হিসাব করলে ট্রাকপ্রতি মূল্য দাঁড়ায় ৯১ হাজার টাকা। বাজারদরে এসব পাথরের মোট মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

প্রশাসনের ভূমিকা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী ও সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ পাথর লুট রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। তাদের বিরুদ্ধে অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) এ বিষয়ে দায়িত্ব পালনেও ব্যর্থ হয়েছে।

জামায়াতের দাবি

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে, দুদকের প্রতিবেদনে তাদের কোনো নেতার নাম নেই। বৃহস্পতিবার নগরীর দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও কাল্পনিক তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। দুদক যদি প্রমাণ ছাড়া এমন প্রতিবেদন দিয়ে থাকে, তবে তাদের ক্ষমা চাইতে হবে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ