তিমির বনিক, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারে শুরু হয়েছে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব ‘ঝুলন যাত্রা’। গত বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) থেকে শুরু হওয়া এ উৎসব চলবে পাঁচ দিনব্যাপী। শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত উদযাপিত এই অনুষ্ঠান রাখি পূর্ণিমার মাধ্যমে শেষ হবে। দোল পূর্ণিমার পর বৈষ্ণবদের আরেকটি বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে ঝুলন যাত্রার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন, যা মথুরা-বৃন্দাবনের মতোই বাংলাতেও সমান জনপ্রিয়।
শাস্ত্রমতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্ত ও অভক্ত নির্বিশেষে সকলকে অনুগ্রহ করতে গোলকধাম থেকে ভূলোকে এসে লীলা করেন। ‘ঝুলন’ শব্দটির সঙ্গে ‘দোলনা’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। এই উৎসবে ভক্তরা রাধা-কৃষ্ণকে দোলনায় বসিয়ে পূজা অর্চনা করেন।
শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা থেকেই দ্বাপরযুগে ঝুলন উৎসবের সূচনা। দোল বা দুর্গোৎসবের মতো ঝুলনও অনেক অঞ্চলে সমান গুরুত্ব বহন করে। এ সময় মঠ-মন্দির ও বনেদি বাড়িতে রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ দোলনায় স্থাপন করে নানা আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়।
শুধু ধর্মীয় আচার নয়, ঝুলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও। ছোটদের ঝুলন সাজানোর প্রতিযোগিতা, মাটির পুতুল, কাঠের দোলনা ও গাছপালা দিয়ে সাজসজ্জা—সবই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। কোথাও কোথাও নামসংকীর্তন ও ভোগ নিবেদনও হয়, যেখানে প্রতিদিন ২৫-৩০ প্রকার ফল, লুচি, সুজি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়।
শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণের ১২ প্রকার যাত্রার উল্লেখ আছে—যেমন রথযাত্রা, রাসযাত্রা, দোলযাত্রা, স্নানযাত্রা ও ঝুলনযাত্রা। এগুলোকে শাস্ত্রকাররা তত্ত্বসমৃদ্ধ ও তাৎপর্যমণ্ডিত বলে উল্লেখ করেছেন।
দোলনা দোলানোর দিক নিয়েও রয়েছে শাস্ত্রীয় ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। সাধারণত দোলনাটি পূর্ব-পশ্চিম কিংবা উত্তর-দক্ষিণ দিকে দোলানো হয় সূর্যের অবস্থান ও পৃথিবীর গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, যা সূর্যের শক্তি ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
এরই ধারাবাহিকতায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া বাগান, কমলগঞ্জের আদমপুরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে উৎসবটি উদযাপিত হচ্ছে। অনাড়ম্বর পরিবেশে হলেও রাত অব্দি ভক্তদের উপচে পড়া উপস্থিতি সনাতন সম্প্রদায়ের এই উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।








