শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২৬৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, স্বাধীন সাংবাদিকতায় নতুন করে শঙ্কা

২৬৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, স্বাধীন সাংবাদিকতায় নতুন করে শঙ্কা potheprantore

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং হয়রানি বন্ধ হয়নি বরং সময়ের সঙ্গে এর ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। গত ৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের যে ধারা ছিল, তা এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে। আগে যেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছিল সাংবাদিক নির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার, এখন সেই জায়গা দখল করেছে হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা সংশ্লিষ্ট মামলা।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোতে অসংখ্য সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—সাংবাদিকতা কি আদৌ কাউকে সহিংসতায় প্ররোচিত করতে পারে?

গাজীপুরে ঝুটের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ৬ ইউনিট

 

মিডিয়া সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, ২৬ জুলাই শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ছাত্রদের আন্দোলন কঠোরভাবে দমনের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যা একধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা বলে মনে হয়। যদিও সাংবাদিকতার আদর্শ এই ধরনের অবস্থানকে সমর্থন করে না।

তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। তারা অনেক সময় রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপে থাকেন, ফলে তাদের নিরপেক্ষভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) এবং ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, গত বছরের জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত ঘটনায় মোট ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি—৮৮টি মামলা। সিলেটে ৩৯ এবং চট্টগ্রামে ৩৬ জন সাংবাদিক অভিযুক্ত হয়েছেন। এছাড়াও সাভার, কুষ্টিয়া, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, খুলনা, বরিশালসহ আরও অন্তত ২০টি জেলায় সাংবাদিকরা বিভিন্ন মামলার আসামি হয়েছেন।

সাকিবকে আওয়ামী লীগে যোগ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন মেজর হাফিজ

এসব মামলায় অভিযুক্তদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখে দেখা গেছে, মাত্র ১৮ শতাংশ সাংবাদিকের রাজনৈতিক পটভূমি আছে। বাকিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রতিশোধমূলক উদ্দেশ্যে কিংবা পূর্ব শত্রুতার কারণে।

নারায়ণগঞ্জে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাবেক এমপি শামীম ওসমানের অনুসারীদের সঙ্গে এক সাংবাদিক মিছিলে ছিলেন এবং তার কাছে অস্ত্রও ছিল। তবে এই ধরনের ব্যতিক্রমী কিছুর বাইরে অধিকাংশ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

একটি চাঞ্চল্যকর উদাহরণ হচ্ছে সিলেটের মনোয়ার জাহান চৌধুরী, যিনি যুক্তরাজ্যে থাকেন এবং স্থানীয় একটি পত্রিকার প্রতিনিধি। তার বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে, যদিও তিনি কয়েক বছর ধরে দেশে নেই।

.

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনার জন্যও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুরনো মামলা পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। এই জেলার অন্তত দুই সাংবাদিক, যারা জাতীয় দৈনিকে কাজ করতেন, মামলা হওয়ার কারণে চাকরি হারিয়েছেন।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ২০২৫ | ২৬৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি  মামলা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

২৪ নভেম্বর ঢাকায় এক বালকের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর মামলায় খুলনার সাংবাদিক হেদায়েত হোসেনসহ ১৪ জন সাংবাদিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ ঘটনার সময় তিনি খুলনায় ছিলেন এবং আগের সরকারের আমলেও তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ভোগ করেছেন।

হেদায়েতের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় তার নাম মামলায় দেওয়া হয়েছে। এমনকি অভিযোগকারীর স্বজনরাও জানতেন না যে তারা মামলা করেছেন—তাদের কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

.

হেদায়েত আরও প্রশ্ন তোলেন, একই সময়ে আশুলিয়া ও পাইকগাছার দুটি ভিন্ন ঘটনার মামলায় একই প্রত্যক্ষদর্শীর নাম কীভাবে আসতে পারে? এটা প্রমাণ করে মামলাগুলো সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৩ জন এখনও কারাগারে আছেন। কুয়াকাটার সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম বিস্ফোরক দ্রব্য মামলায় ১৬ দিন জেল খেটেছেন, যদিও ঘটনার সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন।

তিনি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আদালত তা আমলে নেয়নি এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এখন তিনি এলাকায় কাজ করতেও ভয় পাচ্ছেন।

কামাল আহমেদ মনে করেন, অনেক সাংবাদিক ব্যবসা বা অন্য পেশায় জড়িত থাকার কারণে তাদেরকে টার্গেট করা সহজ হয়। হত্যা মামলাগুলো মূলত রাজনৈতিক শত্রুতা এবং প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।

তিনি মনে করেন, স্বাধীন তদন্ত ছাড়া এই ধরনের মামলার পেছনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য বের হবে না। পুলিশের মাধ্যমে এই তদন্ত নিরপেক্ষ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, সাংবাদিকরা সরাসরি জড়িত না হলেও বক্তব্য দিয়ে সহায়তা করেছে। তবে প্রশ্ন হলো, বিশেষ করে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের বক্তব্য কতটা প্রভাব ফেলতে পারে যে তার জন্য হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হবে?

কামাল আহমেদের ভাষায়, এই মামলাগুলো ভিত্তিহীন ও সাজানো। বাংলাদেশে এমন কোনো আইন নেই যা সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করে হত্যা প্ররোচনার দায়ে কাউকে অভিযুক্ত করতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানুয়ারিতে এক প্রতিবেদনে বলেছে, এই মামলা এবং হয়রানি শেখ হাসিনার আমলের পুরনো দমন-পীড়নের ধারার পুনরাবৃত্তি। তারা বলেছে, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, তবে বিক্ষোভের সমর্থন না করায় সাংবাদিকদের গণহারে মামলায় জড়ানো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

আইনি হয়রানির বাইরেও সাংবাদিকরা শারীরিক হামলার শিকার হচ্ছেন। নাটোর, বরিশাল, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর ও ঢাকায় সাতটি ভিন্ন ঘটনায় অন্তত ২৮ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।

একটি আলোচিত ঘটনায়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির প্রাক্তন সাংবাদিক ওমর ফারুক ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি সংক্রান্ত প্রতিবেদন লাইভ করার সময় জনতার হাতে আক্রান্ত হন। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দ ব্যবহার করায় তাকে মারধর করা হয়। তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করলেও এখনো তদন্ত অগ্রগতি হয়নি।

তিনি বলেন, “এখানে বিচার পাওয়ার আশা নেই। হামলাকারীরা জানে সাংবাদিক মারলে কোনো শাস্তি হয় না।”

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর দক্ষিণ এশিয়া প্রধান সেলিয়া মার্সিয়ের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অনেকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার আশা করলেও বাস্তবে সাংবাদিকরা এখন সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সংবাদ সংগ্রহের সময় তারা আক্রান্ত হচ্ছেন, অফিস পর্যন্ত হামলার শিকার হচ্ছেন।

তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন সাংবাদিকদের ওপর এই নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ করা হয় এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ