রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চলচ্চিত্র ভুবনের মুকুটহীন নবাব: আনোয়ার হোসেন

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে 

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম চিরকালীন হয়ে আছে, যারা সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে প্রতিটি প্রজন্মের কাছে নতুন করে ফিরে আসে। আনোয়ার হোসেন তেমনই একজন কিংবদন্তি, যিনি কেবল একজন অভিনেতা নন, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের নাম। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল যেন জীবন্ত জাদুর মতো। তিনি চরিত্রকে শুধু অভিনয় করতেন না; চরিত্র হয়ে উঠতেন, দর্শকদের মনের গভীরে ছুঁয়ে যেতেন। আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে যেন পুরো এক ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ ইউনিয়নের সরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেন আনোয়ার হোসেন। তাঁর পিতা একেএম নজির হোসেন ছিলেন সাব-রেজিস্টার, আর মাতা সাঈদা খাতুন ছিলেন একজন স্নেহময়ী গৃহিণী। নজির-সাঈদা দম্পতির তৃতীয় সন্তান আনোয়ার হোসেন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংবেদনশীল ও মেধাবী। গ্রামীণ প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই কিশোরের চোখে ছিল স্বপ্নের ঝিলিক, আর হৃদয়ে ছিল শিল্পের প্রতি অদম্য টান।

শৈশব কেটেছে দেওয়ানগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখার মাধ্যমে। ১৯৫১ সালে জামালপুর স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। কলেজে পড়ার সময়ই তিনি প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেন আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে। সেটিই ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ। কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না, তাঁর এই পদক্ষেপ তাঁকে নিয়ে যাবে একদিন পুরো জাতির হৃদয়ের শীর্ষে।

কলেজ জীবনের পর নানা কারণে তাঁকে জীবিকা নির্বাহের পথে নামতে হয়। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে তিনি যোগ দেন তাঁর বাবার বন্ধু আবদুল্লাহ খানের সেলকন ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে সুপারভাইজার হিসেবে। ১৯৫৭ সালে ঢাকায় চলে আসেন এবং জীবনযাত্রায় আসে নতুন অধ্যায়। একই সময়ে তিনি নাসিমা খানমকে বিয়ে করেন। সংসার, কাজ ও স্বপ্নের মধ্যে ভারসাম্য রেখে আনোয়ার হোসেন নিজের শিল্পীসত্তার প্রতি টান ধরে রাখেন।

ঢাকায় এসে নাট্যচর্চায় গভীরভাবে যুক্ত হন। ১৯৫৯ সালে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে ননী দাস নির্দেশিত ‘এক টুকরো জমি’ নাটকে অভিনয় করেন। পরে ঢাকা বেতারে অডিশন দিয়ে ‘হাতেম তাই’ নাটকে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। এই নাটকগুলোর মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে মঞ্চ ও বেতার জগতের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। এই সময়েই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে—আবদুল জব্বার খান, মোহাম্মদ আনিস, হাবিবুর রহমান প্রমুখ। তাঁরা মিলে ঝিনুক পত্রিকার সম্পাদক আসিরুদ্দিনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন মিনার্ভা থিয়েটার, যা সে সময়ের নাট্যচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে পরিচালক মহিউদ্দিনের হাত ধরে। প্রথম পরিচয়েই মহিউদ্দিন বুঝতে পারেন আনোয়ার হোসেনের মধ্যে রয়েছে এক অদম্য অভিনয় প্রতিভা। আর সেখান থেকেই আসে ১৯৬১ সালের ‘তোমার আমার’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ। প্রথম ছবিতেই তিনি খল চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের নজর কাড়েন। তাঁর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সংলাপের নিখুঁত উচ্চারণ এবং অভিনয়ের গভীরতা তাঁকে অন্যান্য অভিনেতাদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

একই বছরে মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘সূর্যস্নান’, যেখানে তিনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র জগতে নিজের অবস্থান মজবুত করেন আনোয়ার হোসেন। ১৯৬০-এর দশকে একে একে তিনি অভিনয় করেন ‘জোয়ার এলো’ (১৯৬২), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘নাচঘর’ (১৯৬৩), ‘বন্ধন’ (১৯৬৪), ‘একালের রূপকথা’ (১৯৬৫) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে। তাঁর এবং সুমিতা দেবীর অভিনীত ‘দুই দিগন্ত’ চলচ্চিত্রটি ছিল ঢাকার বলাকা সিনেওয়ার্ল্ডের উদ্বোধনী প্রদর্শনী ছবি—যা প্রমাণ করে তাঁর জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব।

তাঁর প্রথম উর্দু চলচ্চিত্র ‘উজালা’ মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালে। তবে ১৯৬৭ সাল আনোয়ার হোসেনের জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দেয়। সেই বছর মুক্তি পায় ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, যেখানে তিনি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। এ ছবিতে তাঁর রাজকীয় উপস্থিতি, আবেগমথিত সংলাপ আর গভীর চরিত্রায়ন তাঁকে রাতারাতি কিংবদন্তি বানিয়ে দেয়। দর্শকেরা তাঁকে আর শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতীক হিসেবেই দেখতে শুরু করেন। এই ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে নিগার পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর অভিনয় এতটাই প্রাণবন্ত ছিল যে, আজও নবাব সিরাজউদ্দৌলা চরিত্রটি মনে পড়লে সবার চোখে ভেসে ওঠে আনোয়ার হোসেনের মুখ।

চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ছিল অসীম। ৫২ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি ৫০০-রও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চরিত্রের ভিন্নতা, গল্পের গভীরতা কিংবা জঁরের বৈচিত্র্য—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। ঐতিহাসিক চরিত্র যেমন প্রাণ পেয়েছে তাঁর হাতে, তেমনি গ্রামীণ গল্প বা সামাজিক মেলোড্রামার চরিত্রগুলোতেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং ছিলেন এক জীবন্ত পাঠশালা।

১৯৭৫ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রে কাদের লাঠিয়াল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান পান। তাঁর অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার কারণে তিনি হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় অভিনেতা। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেনের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিতে অভিনয় করে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আসে ১৯৮৮ সালে, যখন তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। অভিনেতাদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন। ২০১০ সালে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাও প্রদান করা হয়।

আনোয়ার হোসেনের অভিনয়জীবনের সাফল্যের গল্প যতটা অনবদ্য, তাঁর ব্যক্তিজীবন ততটাই সরল ও বিনয়ী। তিনি খ্যাতির তুঙ্গে থেকেও ছিলেন আত্মমগ্ন ও সাধারণ। কখনো জনপ্রিয়তার মোহে অন্ধ হননি। সিনেমার পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল ঝলমলে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন এক নিরহঙ্কার মানুষ।

তাঁর সমকালীন শিল্পীরা বলেন, আনোয়ার হোসেন ছিলেন একজন শিল্পী, যিনি প্রতিটি দৃশ্যকে শিল্পের মতো যত্ন করে গড়ে তুলতেন। তিনি সংলাপ বলতেন আবেগ দিয়ে, আর চোখে চোখে ফুটিয়ে তুলতেন গল্পের মর্ম। দর্শকেরা তাঁর অভিনয় দেখলে যেন চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতেন, ভুলে যেতেন এটি কেবল অভিনয়।

তাঁর মৃত্যু সংবাদে সেদিন সারা দেশ শোকাহত হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প যেন সেদিন এক বিশাল নক্ষত্র হারালো। তাঁর চলে যাওয়া শুধু চলচ্চিত্র জগত নয়, পুরো জাতির জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

তবে প্রকৃত শিল্পীরা কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টিতে। আজও ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবির দৃশ্য মনে পড়লেই দর্শকেরা আবেগে ভেসে যান। ‘লাঠিয়াল’-এর দৃঢ় চরিত্র, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-এর প্রাণবন্ত অভিনয়, কিংবা অসংখ্য চলচ্চিত্রের অগণিত চরিত্রে তাঁর প্রাণ সঞ্চার প্রমাণ করে, তিনি অমর।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তাঁর অবদান অপরিসীম। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁকে সরাসরি দেখেনি, কিন্তু তাঁরা তাঁর অভিনয় থেকে শিখছে শিল্পের গভীরতা, চরিত্রায়নের কৌশল এবং পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠার অনন্য শক্তি। চলচ্চিত্রে চরিত্রের প্রতি আনোয়ার হোসেনের দায়বদ্ধতা এবং আন্তরিকতা আজও শিল্পীদের জন্য প্রেরণার উৎস।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে, বদলেছে চলচ্চিত্রের ধরন, প্রযুক্তি, প্রজন্ম। কিন্তু আনোয়ার হোসেন নামটি থেকে গেছে অবিচল, অমলিন। তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আকাশে উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, যিনি পর্দা ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন চিরকালের জন্য।

তাঁর জীবনের গল্প আমাদের শেখায়, প্রতিভা আর শ্রম মিললে কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে উঠতে পারেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর সংলাপ, তাঁর অভিনয়, তাঁর চোখের সেই গভীর দৃষ্টি আজও যেন জীবন্ত, যেন তিনি এখনও আমাদের সবার সঙ্গে আছেন। বাংলার চলচ্চিত্রপাগল মানুষ যখনই সিনেমা হলে যান, তারা হয়তো মনে মনে খুঁজে ফেরেন সেই অদম্য শিল্পীকে, যিনি অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি আলো-ছায়ার খেলায়, প্রতিটি চরিত্রের মাঝে আজও মিশে আছে আনোয়ার হোসেন। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর শিল্পকীর্তি থেকে গেছে। সময়ের স্রোত বয়ে যাবে, নতুন নতুন মুখ আসবে, নতুন গল্প তৈরি হবে, কিন্তু আনোয়ার হোসেন নামটি থাকবে অম্লান—বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের গৌরবের প্রতীক হয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ