শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নুসরাত ফাতেহ আলী খানঃ আকাশ ছুঁয়ে যাওয়া কণ্ঠ

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে

আজ ১৩ অক্টোবর। আজকের দিনটি সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে কেবল একটি তারিখ নয়—এ দিনটিই সেই মুহূর্ত, যেদিন পৃথিবী পেয়েছিল এক অনন্য কণ্ঠের মানুষকে, যার সুরে ভর করে প্রার্থনা করেছে কোটি হৃদয়। তিনি নুসরাত ফাতেহ আলী খান—সুফি সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্ত নাম, এক গভীর অভিব্যক্তি, এক আত্মার কণ্ঠস্বর।

১৯৪৮ সালের এই দিনে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের লায়লপুরে (বর্তমানে ফয়সালাবাদ) জন্ম নেন নুসরাত ফাতেহ আলী খান। তাঁর জন্ম এমন এক পরিবারে, যাদের রক্তে মিশে ছিল সঙ্গীতের ঐতিহ্য। পূর্বপুরুষেরা ছিলেন “কাওয়াল বাচ্চন” পরিবারের অংশ—যে পরিবার প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে সুফি কাওয়ালির ধারক-বাহক। তাঁর পিতা উস্তাদ ফাতেহ আলী খান নিজেও ছিলেন এক বিশিষ্ট কাওয়াল। ছোটবেলায় নুসরাতকে বাবা চেয়েছিলেন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানাতে; কারণ সে সময় সমাজে সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেওয়া সম্মানজনক মনে করা হতো না। কিন্তু নিয়তির নিয়মে সুরের প্রতি তাঁর টান কোনো বাধাই মানেনি। অতি অল্প বয়সেই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর জীবনের পথ সুরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাবে।

শৈশব থেকেই তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত ক্ষমতা। তিনি গান শুরু করতেন পরিবারের কাওয়ালি আসরে, আর ধীরে ধীরে নিজের কণ্ঠকে গড়ে তুলতেন প্রাচীন ধ্রুপদী সংগীতের কাঠামোয়। ১৯৬৪ সালে পিতার মৃত্যু হলে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পরিবারের কাওয়ালি দলের নেতৃত্ব নিতে বাধ্য হন। যে দায়িত্ব ছিল কঠিন, সেই দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছিলেন আত্মবিশ্বাসে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর নেতৃত্বে দলের সঙ্গীত ধারা বদলে যায়—প্রচলিত কাওয়ালিকে তিনি নতুন প্রাণে ভরিয়ে দেন।

নুসরাত ফাতেহ আলী খানের কণ্ঠের ক্ষমতা ছিল প্রায় অলৌকিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর গলার রেঞ্জ ছয় অক্টেভ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল—যা পৃথিবীর বিরলতম কণ্ঠশক্তিগুলোর একটি। তিনি গানের মধ্য দিয়ে এমন উচ্চতা থেকে এমন গভীরতায় নেমে আসতে পারতেন, যেন শ্রোতার বুকের ভিতরে এক প্রার্থনা জেগে ওঠে। তাঁর কাওয়ালি শুরু হতো ধীর লয়ের আধ্যাত্মিকতায়, তারপর হঠাৎই বিস্ফোরিত হতো তালের ঝড়, ছন্দের অগ্নিতে, কণ্ঠের উল্লাসে। সেই গানে যেন শরীর নয়, আত্মা নাচত।

১৯৭০-এর দশকে পাকিস্তানের জাতীয় রেডিওতে তাঁর পরিবেশনা শুরু হয়। সেখানে তাঁর কণ্ঠে সুফি কবিতা, প্রেম, ভক্তি আর আল্লাহর বন্দনা নতুন অর্থ পায়। তিনি ছিলেন সুফি ভাবধারার প্রকৃত দার্শনিক—যিনি বিশ্বাস করতেন, সঙ্গীতই আত্মার সঙ্গে ঈশ্বরের যোগসূত্র। তাঁর গাওয়া প্রতিটি কাওয়ালি যেন ছিল আত্মার এক আবেদন, ভালোবাসার এক দোয়া। “আল্লাহ হু”, “তাজদার-এ-হারাম”, “মস্ত মস্ত” কিংবা “তুমি দিল্লি ওয়ালে” — এই গানগুলো আজও শুনলে মনে হয়, তিনি এখনও জীবিত, এখনও তাঁর কণ্ঠে ঈশ্বরের ছোঁয়া আছে।

১৯৮৫ সালে নুসরাত ফাতেহ আলী খান প্রথমবারের মতো ইউরোপে যান WOMAD (World of Music, Arts and Dance) উৎসবে অংশ নিতে। সেটিই ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মপ্রকাশ, আর সেই মুহূর্ত থেকেই বিশ্ব সঙ্গীত জগতে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমা শ্রোতারা অবাক হয়ে দেখল—একজন মানুষ কীভাবে শুধু কণ্ঠ দিয়েই আত্মার গভীরতম স্তরে ছুঁয়ে যেতে পারেন। তাঁর সুরে ছিল না কোনো সীমান্ত, ছিল না কোনো ধর্ম বা ভাষার বাধা—ছিল শুধু অনুভব, ছিল মানবতার মেলবন্ধন।

এরপরের বছরগুলোতে নুসরাত হয়ে উঠলেন বিশ্ব সঙ্গীতের প্রতীক। তিনি পশ্চিমা সংগীতশিল্পী পিটার গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে কাজ করেন, যিনি তাঁর সঙ্গীতকে বিশ্বব্যাপী প্রচারে ভূমিকা রাখেন। ১৯৯০ সালে “Mustt Mustt” অ্যালবামটি প্রকাশ পেলে সেটি হয়ে ওঠে এক বৈপ্লবিক কাজ—যেখানে সুফি কাওয়ালির ধারা মিশে যায় আধুনিক রক ও পপ সংগীতের সুরে। এই অ্যালবামের মাধ্যমে নুসরাতের গান ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রোতাদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি প্রমাণ করেন—কাওয়ালি কেবল ধর্মীয় সংগীত নয়, এটি মানবিক অনুভবের এক বিশ্বভাষা।

নুসরাত ফাতেহ আলী খানের সঙ্গীতচর্চা ছিল একধরনের ধ্যান। তাঁর গানে শুধু সুর ছিল না, ছিল প্রার্থনা; শুধু তাল নয়, ছিল এক অন্তহীন ভালোবাসার অনুরণন। তিনি সুফি কবি রুমি, বুল্লে শাহ, হাফিজ কিংবা আমির খসরুর কবিতা গাইতেন এমন আবেগে, যেন সেই শব্দগুলো তাঁর ভেতর থেকে জন্ম নিচ্ছে। তাঁর গান মানুষকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা ও ঈশ্বর আলাদা নয়—ভালোবাসাই ঈশ্বর, আর ঈশ্বরই ভালোবাসা।

জীবনের শেষ দশকে তিনি পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় শহরে পারফর্ম করেছেন। তাঁর কাওয়ালি শুনে বিমোহিত হয়েছে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, টোকিওর শ্রোতারা। তাঁর রেকর্ডকৃত গান ছিল হাজারেরও বেশি, এবং গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ তাঁকে উল্লেখ করা হয় সবচেয়ে বেশি রেকর্ডধারী কাওয়াল শিল্পী হিসেবে। পাকিস্তান সরকার তাঁকে “Pride of Performance” খেতাবে ভূষিত করে।

তবে তাঁর জীবন খুব দীর্ঘ ছিল না। অবিশ্রান্ত পারফরম্যান্স, নিরবচ্ছিন্ন ভ্রমণ আর শারীরিক অবসাদ তাঁকে ক্রমে অসুস্থ করে তোলে। কিডনি ও লিভারের জটিলতায় ভুগতে ভুগতে তিনি ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স তখন মাত্র ৪৮। পৃথিবী হারিয়েছিল এক অমর কণ্ঠকে, যিনি কেবল গান গাইতেন না—আত্মাকে নাচাতেন।

তবে মৃত্যুর পরও নুসরাত ফাতেহ আলী খান থেমে যাননি। তাঁর সুর আজও নতুন শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে, নতুন শ্রোতাদের জাগিয়ে রাখে। তাঁর গান আজও বাজে সিনেমায়, মঞ্চে, ইউটিউবে—একই রকম গভীরতায়। “আল্লাহ হু” শুনলে এখনও বুকের ভেতর কেমন এক শান্তি নেমে আসে; “তাজদার-এ-হারাম” শুনলে চোখের কোণে জলের রেখা পড়ে। তাঁর গানে যে আগুন ছিল, তা নিভে যায়নি—শুধু সময়ের পরতে পরতে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

নুসরাতের সঙ্গীত আজও এক জীবন্ত সেতুবন্ধন—পূর্ব ও পশ্চিম, ধর্ম ও মানবতা, হৃদয় ও আকাশের মাঝে। তাঁর গান শেখায়, সঙ্গীত কখনও শুধু বিনোদন নয়; এটি এক ধরণের আধ্যাত্মিক যাত্রা, আত্মার আরেক নাম। তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী সাধক, যিনি ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছিলেন সুরের ভিতরে।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু এক শিল্পীকে স্মরণ করা নয়; স্মরণ করা মানে সেই আকাশছোঁয়া কণ্ঠের সঙ্গী হয়ে মানবতার কাছে ফিরে যাওয়া। তাঁর কণ্ঠে যে অমরত্ব ছিল, সেটি আজও আমাদের শেখায়—সত্যিকারের শিল্প কখনও মরে না, সুরের পথেই সে বেঁচে থাকে।

নুসরাত ফাতেহ আলী খান আমাদের শোনার জগৎটাকে বদলে দিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সঙ্গীতের ভাষা কেবল শব্দের নয়—এটি হৃদয়ের ভাষা। তাঁর গানের ভেতরে আজও অনুরণিত হয় সেই একই আর্তি, যা একসময় তিনি নিজেই বলেছিলেন—
“আমি গাই, যেন আমার গান দিয়ে আমি আমার আত্মাকে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে দিতে পারি।”

আজ তাঁর জন্মদিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যখন কেউ তাঁর গান বাজায়, তখন হয়তো কোথাও নীরবে এক আলো জ্বলে ওঠে—যে আলো সুরের, ভালোবাসার, এবং সেই মানুষটির, যিনি কণ্ঠ দিয়ে ছুঁয়ে গিয়েছিলেন অনন্তকে।

তিনি নুসরাত ফাতেহ আলী খান—কণ্ঠের রাজা, আত্মার সঙ্গীতের সম্রাট, যিনি আকাশ ছুঁয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সুরে।
আর তাঁর গানের মধ্যেই তিনি আজও জীবিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ