শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলা গানের নক্ষত্র: শুভ জন্মদিন সাবিনা ইয়াসমিন

আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে

বাংলা গানের ভুবনে এমন কিছু নাম আছে, যেগুলো সময়ের সীমানা পেরিয়ে একেবারে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। সাবিনা ইয়াসমিন তাদেরই একজন। বাংলা চলচ্চিত্রের গান, দেশাত্মবোধক সুর কিংবা আধুনিক গানের মায়াময় জগতে তার নাম উচ্চারণ করলেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে এক অমলিন কণ্ঠের প্রতিচ্ছবি। তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, তিনি এক যুগের প্রতীক, এক সুরের সাধক। বাংলা গানকে তিনি নিজের মতো করে ভালোবেসেছেন, গড়ে তুলেছেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছেন।

১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া সাবিনা ইয়াসমিন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সঙ্গীতের আবহে বড় হওয়া এক মেয়ে। তার বাবা লুতফর রহমান ছিলেন ব্রিটিশ আমলের সরকারি কর্মকর্তা, যিনি চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আর মা মৌলুদা খাতুন ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী একজন নারী। মায়ের কাছেই সাবিনা প্রথম সুরের পাঠ নেন। পরিবারের পরিবেশে গান ছিল জীবনের অঙ্গ। তার মা নিজে ওস্তাদ কাদের বক্সের কাছে গান শিখেছিলেন, বড় বোনেরা শিখতেন দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে। ছোট্ট সাবিনা তখনও গান শেখার পথে যাত্রা শুরু করেনি, তবে সুরের এই পরিবেশে প্রতিদিনের জীবন কাটাতেন। সেই সময়েই তার সঙ্গীতে আগ্রহ জন্মায় এবং মা তাকে হারমোনিয়াম বাজানো শেখাতে শুরু করেন। তার শেখা প্রথম গান ছিল ‘খোকন মনি সোনা’। ছোট্ট সাবিনা যে একদিন বাংলার সবচেয়ে বড় গায়িকাদের একজন হয়ে উঠবেন, সেটা হয়তো তখনও কেউ ভাবতে পারেনি।

শুধু গান শেখা নয়, ছোটবেলা থেকেই সাবিনা ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান। সাত বছর বয়সে প্রথমবারের মতো মঞ্চে গান গেয়ে তিনি দর্শক-শ্রোতার মন জয় করে নেন। এরপর শুরু হয় বেতারে ছোটদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘খেলাঘর’-এ গান গাওয়া। এই অনুষ্ঠানেই তিনি প্রথম সম্মানী পান, মাত্র ১০ টাকা। শিশুশিল্পী হিসেবেই তখন তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন। তার সঙ্গী ছিলেন সেই সময়ের আরেক কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তারা একসাথে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের হাত থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তখনও কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে এই ছোট মেয়েটি একদিন হয়ে উঠবেন বাংলা সঙ্গীতের আকাশে অমর এক নক্ষত্র।

তার বাবার চাকরির সুবাদে নারায়ণগঞ্জে বেড়ে ওঠা সাবিনা ইয়াসমিন স্কুলজীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি সঙ্গীত চর্চায় নিজেকে আরও নিবেদিত করে তুলেছিলেন। সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ঘটে জীবনের এক বড় ঘটনা। একদিন তাদের বাড়ির পাশের এক বাসায় এসেছিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদ। সাবিনার মা তার প্রতিভার কথা মাহমুদকে জানালে তিনি চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন। আর সেই সুযোগেই ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে গান গেয়ে তিনি পা রাখেন চলচ্চিত্রের জগতে। আলতাফ মাহমুদের সুরে তার গাওয়া ‘মধুর জোছনা দীপালি’ গানটি তখনই সবার মন কেড়ে নেয়। এই গান গাওয়ার জন্য তিনি পেয়েছিলেন ৫০০ টাকা সম্মানী। এই গানই ছিল তার চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ হিসেবে আত্মপ্রকাশ।

তবে তার চলচ্চিত্রজীবনের প্রথম গান আরও আগে, ১৯৬২ সালে। এহতেশামের ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে রবীন ঘোষের সুরে তিনি শিশু শিল্পী হিসেবে গান গেয়েছিলেন। এভাবেই শুরু হয়েছিল চলচ্চিত্রের সাথে তার গভীর সম্পর্ক। এরপর আলতাফ মাহমুদের সুরে তিনি ‘আনোয়ারা’, ‘নয়নতারা’ ও ‘টাকা আনা পাই’ চলচ্চিত্রে গান করেন। একদিকে তিনি অন্য শিল্পীদের গানে কোরাসে অংশ নিচ্ছেন, অন্যদিকে সুযোগ পেলেই নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাচ্ছেন। ১৯৭০ সালে খান আতাউর রহমানের সুরে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে তার গাওয়া “একি সোনার আলোয়” গানটি তাকে শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি এনে দেয়। স্বাধীনতার আগে তার গাওয়া দেশাত্মবোধক গান “জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো” ছিল মানুষের আন্দোলনের সময়ের অনুপ্রেরণার সঙ্গীত।

স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তার উত্থান শুরু হয় ১৯৭২ সালে। ‘অবুঝ মন’ চলচ্চিত্রে “শুধু গান গেয়ে পরিচয়” গানটি তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। একই বছর ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ চলচ্চিত্রের শিরোনাম গানটি তাকে আরও সুপরিচিত করে তোলে। এরপর ১৯৭৩ সালের ‘রংবাজ’ চলচ্চিত্রের গান “সে যে কেন এলো না” এবং “হই হই হই রঙ্গিলা” তার জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে দেয়। বাংলা চলচ্চিত্রে তখন নতুন সুরের জোয়ার বইছিল, আর সেই জোয়ারে সাবিনা ইয়াসমিন হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী।

১৯৭৫ সালে ‘সুজন সখী’ চলচ্চিত্রে আব্দুল আলীমের সাথে গাওয়া “সব সখীরে পার করিতে” গানটি তাকে এনে দেয় প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রদত্ত প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এরপর একে একে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ (১৯৭৮), ‘সুন্দরী’ (১৯৭৯) এবং ‘কসাই’ (১৯৮০)-এর জন্য টানা আরও তিনটি জাতীয় পুরস্কার পান। ৮০-এর দশকে তার গাওয়া “জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো”, “আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত” কিংবা “চিঠি দিও প্রতিদিন” গানগুলো তাকে বাংলা গানের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তার কণ্ঠের জাদু শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, দেশাত্মবোধক গানেও ছড়িয়ে পড়ে। “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না” গানটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংবাদ পরিবেশনের আগে প্রচারিত হতো। সেই গান আজও বাঙালির মনে অনুপ্রেরণার সুর জাগায়। এছাড়া “ও আমার বাংলা মা”, “মাঝি নাও ছাড়িয়া দে”, “একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার” গানগুলোও প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে বেঁচে আছে।

তার জীবনের সাফল্যের গল্প শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক আর. ডি. বর্মণের সুরে ইন্দো-বাংলা যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। কিশোর কুমার, মান্না দে, শ্যামল মিত্রের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গেও দ্বৈত গানে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। ভূপেন হাজারিকার সুরেও গান গেয়েছেন তিনি। ১৯৮৫ সালে সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভারত থেকেও পান সম্মানসূচক ‘ডক্টরেট’।

১৯৮৪ সালে ‘চন্দ্রনাথ’ চলচ্চিত্রে গান গেয়ে তিনি জাতীয় পুরস্কার পান। এরপর ‘প্রেমিক’ (১৯৮৫), ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ (১৯৮৭), ‘দুই জীবন’ (১৯৮৮), ‘দাঙ্গা’ (১৯৯১), ‘রাধা কৃষ্ণ’ (১৯৯২), ‘দুই দুয়ারী’ (২০০০), ‘দুই নয়নের আলো’ (২০০৫), ‘দেবদাস’ (২০১৩) এবং ‘পুত্র’ (২০১৮)-তে গান গেয়ে মোট ১৪টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। এমন কীর্তি বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসে বিরল।

তার ব্যক্তিগত জীবনও সমৃদ্ধ। তিনবার বিয়ে করেছেন তিনি। তার তৃতীয় স্বামী কবীর সুমন নিজেও এক কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার। একসাথে তারা ‘তেরো’ নামের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন। তার পরিবারও সঙ্গীতপ্রেমী—বোন ফরিদা, ফৌজিয়া, নীলুফার এবং নাজমা ইয়াসমিন সবাই কমবেশি গানের সাথে যুক্ত। তার ভগ্নীপতি ছিলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সুরকার খান আতাউর রহমান, আর ভাগ্নে আগুনও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী।

বাংলা গানের আকাশে সাবিনা ইয়াসমিনের অবদান অপরিসীম। তিনি একুশে পদক (১৯৮৪), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬), বাচসাস পুরস্কার (৬টি), বিএফজেএ পুরস্কার, উত্তম কুমার পুরস্কার, শেরে বাংলা স্মৃতি পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। নিউ ইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস থেকেও ‘বেস্ট সিঙ্গার’ পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৭ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড-দ্য ডেইলি স্টার জীবনের জয়গান উৎসবে তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।

তবে এসব পুরস্কার ও সম্মাননার বাইরেও তার গানই তাকে করে তুলেছে অমর। তার গাওয়া গান আজও মানুষের দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, আনন্দে উল্লাস জাগায়, আর ভালোবাসার মুহূর্তে হৃদয় স্পর্শ করে। তার কণ্ঠ যেন এক যাদুকরী সেতার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সুরের মায়া ছড়িয়ে দেয়।

আজ এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন। বাংলা গানের ইতিহাসে সাবিনা ইয়াসমিন এক অনন্য অধ্যায়ের নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা থাকলে একজন শিল্পী শুধু সময়ের নয়, ইতিহাসের সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন। শুভ জন্মদিন সাবিনা ইয়াসমিন—বাংলা সঙ্গীতের আকাশে আপনার তারকা আলো চিরদিন উজ্জ্বল থাকুক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ