আফসার রেজা, পথে প্রান্তরে:
২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট। ঢাকার এক সকাল। সংবাদপত্রে ছোট্ট খবর ছাপা হলো— “চলে গেলেন লোকসঙ্গীত শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতী।” সেই খবর যেন ছিল না কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যুসংবাদ, বরং গ্রামীণ আঙিনায় হঠাৎ দোতারা থেমে যাওয়া কিংবা হাটের মেলা নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। মানুষ অনুভব করল, এক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর থেমে গেলেও তার গান যেন এখনো হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে।
আবদুর রহমান বয়াতীর জন্ম ১৯৩৯ সালে গাজীপুরের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই গান তার রক্তে মিশে ছিল। গ্রামীণ হাটে, মেলায়, আড্ডায় তিনি গান ধরলেই মানুষ থমকে যেত। প্রথমে গ্রামবাসী বলত—“ছেলেটা ভালো গাইতে পারে।” কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ছেলেটিই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের কিংবদন্তি।
তার সবচেয়ে বিখ্যাত গান “মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি”। এই গান শুধু সুর নয়, এক দার্শনিক বার্তাও বহন করে। বয়াতী যেন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন—জীবন নামের এই দেহঘড়ি একদিন থেমে যাবে, তাই চলার পথে প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে খুঁজতে হবে, আত্মাকে জাগাতে হবে।
ষাটের দশকে তিনি বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত গান গাওয়া শুরু করেন। তার কণ্ঠে গ্রামীণ লোকগীতি শহরের ড্রইংরুমে পৌঁছে যায়। “দিন গেলে আর দিন পাবি না” গেয়ে তিনি মানুষকে বুঝিয়েছিলেন সময়ের অমূল্যতা। এই গান যেন জীবনের ক্ষণস্থায়ী সত্যকে এক নিঃশ্বাসে মূর্ত করে দেয়। মানুষ শুনে ভাবত—আসলে প্রতিটি দিনই তো শেষ দিন, তাই ভালোবাসা আর মানবতার চর্চা এখনই করা চাই।
আবার যখন তিনি গাইতেন—“এই পৃথিবী যেমন আছে, তেমনি পড়ে রবে”—তখন মনে হতো তিনি গান গাইছেন, কিন্তু আসলে জীবনের চিরন্তন সত্য বলছেন। পৃথিবী একদিন আমাদের ছাড়াই চলতে থাকবে, তাই অহংকার বা স্বার্থপরতায় নয়, জীবনকে কাটাতে হবে বিনম্রতায় আর ভালোবাসায়।
লোকগানের আধ্যাত্মিক ধারা বয়াতীর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পায়। তিনি মুর্শিদি কিংবা ভাটিয়ালি গাইতেন ঠিক যেমন করে একজন সাধক ভক্তিগীতি গায়। তার গানে আল্লাহ, প্রেম আর মানবতার ডাক একাকার হয়ে যেত। গ্রামে মাটির মেলায় কিংবা শহরের বড় কনসার্টে—যেখানেই গাইতেন, দর্শকশ্রোতার মনে একই আবেশ ছড়িয়ে দিত।
তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক পান। তবে তিনি সবসময় বলতেন, মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার নেই। আসলেই তো—যে মানুষ গ্রাম থেকে শহর, মঞ্চ থেকে সংসার—সবখানে শ্রোতার হৃদয় জয় করেছেন, তার জন্য আর কিসের পুরস্কার দরকার?
২০১৩ সালের আগস্টের সেই সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খবর ছড়িয়ে পড়তেই সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। গ্রামীণ চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরের টেলিভিশন স্টুডিও—সবখানে বাজতে থাকে তার গাওয়া গান। কেউ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে গুনগুন করতে থাকে—“দিন গেলে আর দিন পাবি না…”।
মৃত্যুর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজও যখন কোনো ভাটিয়ালি গাইয়ে তার গান ধরে, কিংবা শহুরে কনসার্টে “মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি” বাজতে থাকে, তখন মনে হয় বয়াতী কোথাও যাননি। তিনি রয়ে গেছেন মানুষের ভেতরেই। তার গানের মতোই তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন—“এই পৃথিবী যেমন আছে, তেমনি পড়ে রবে।”
আসলে আবদুর রহমান বয়াতী শুধু গান গাওয়া শিল্পী নন, তিনি ছিলেন মানুষের গান গাওয়া মানুষ। যে মানুষের কণ্ঠে গ্রামীণ মাটির গন্ধ ছিল, আধ্যাত্মিকতার আলো ছিল, আর ছিল মানবতার অনন্ত ডাক। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া গান এখনও বাংলার হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়, মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।








