বৃহস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হুমায়ূন আহমেদকে হারানোর ১৩ বছর

(স্মৃতির অরণ্যে হেঁটে চলা এক গল্পকারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি)

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:

সময়ের কিছু ক্ষরণ থাকে, যেগুলো ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা থাকলেও হৃদয়ে বাজে দীর্ঘশ্বাসের মতো। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ছিল তেমনই এক দিন। বাংলা সাহিত্যের আকাশ থেকে এক উজ্জ্বলতম তারা নিভে গিয়েছিল সেদিন— নাম তার হুমায়ূন আহমেদ। সময় গড়িয়েছে তেরোটি বছর, কিন্তু মনে হয়— এই তো সেদিন তিনি ‘হিমুর ছায়া’য় হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন শহরের অলিগলিতে, কিংবা ‘মিসির আলী’র চোখ দিয়ে চেয়ে ছিলেন আমাদের অস্তিত্বের গভীর রহস্যে।

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন কেবল একজন লেখক নন। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত অনুভূতির নাম। একাকীত্বের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়া মানুষদের জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন শব্দের আশ্রয়। তার প্রতিটি গল্প, প্রতিটি চরিত্র যেন ছিল পাঠকের আত্মার প্রতিবিম্ব। কখনো হাসি, কখনো কষ্ট, আবার কখনো নিঃশব্দ ভালোবাসায় তিনি ছুঁয়ে যেতেন পাঠকের হৃদয়।

তিনি ছিলেন একেকটি ভোরের মতো— কখনো কুয়াশায় মোড়ানো, কখনো আলোঝলমলে। সাহিত্যের জগতেও তিনি তেমনি সৃষ্টি করেছিলেন এক সমান্তরাল পৃথিবী— যেখানে বসবাস করতেন হিমু, মিসির আলী, রূপা, শুভ কিংবা বাকের ভাই। তারা ছিল বইয়ের পাতায়, অথচ ঠিক পাশের ঘরে থাকা কারও মতোই আপন।

তেরো বছর পরেও সেই আপনজনকে আমরা ভুলিনি, ভুলবার ক্ষমতাটাই আমাদের নেই। বরং যত সময় যাচ্ছে, তার শূন্যতা যেন আরও প্রবল হয়ে উঠছে। যেন তিনি চলে গিয়েও থেকে গেছেন— শব্দে, বাক্যে, আলাপে, গল্পে, ভালোবাসায়।

আজও ১৯ জুলাই এলে গাজীপুরের নুহাশ পল্লী ভরে ওঠে নিঃশব্দ ভালোবাসায়। লিচুতলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে অনেকে হয়তো ফিসফিস করে বলেন, “হিমু আজ আসবে না?” কেউ চেয়ে থাকেন ‘দেয়াল’-এর পাতার দিকে, কেউবা মনে মনে উচ্চারণ করেন— “আজ রবিবার”। মিলাদ হয়, দোয়া হয়, কিছু ফুল পড়ে কবরে, আর অনেক স্মৃতি ঝরে মানুষের চোখে।

তার লেখা বইগুলো যেন আজও নতুন পাঠকের হাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ‘নন্দিত নরকে’ পড়ে কেউ আবিষ্কার করে নিজের ভেতরের অন্ধকার, ‘তিথির নীল তোয়ালে’ উল্টাতে উল্টাতে কেউ খুঁজে পায় হারানো প্রেম।

ছবির জগতে তিনি ছিলেন একজন শব্দকার। ‘আগুনের পরশমণি’র প্রতিটি দৃশ্যে ছিল মুক্তিযুদ্ধের ব্যথা আর গর্ব, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’-এ ছিল বৃষ্টিভেজা ভালোবাসার সুর। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ দিয়ে তিনি ছুঁয়ে গিয়েছেন সময়ের বিতর্কিত সত্য। আর ‘বহুব্রীহি’ কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’-এ তিনি আমাদের দিয়েছে এমন চরিত্র, যাদের মৃত্যু হয়নি— যাদের আমরা আজও ভালোবাসি।

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন আমাদের যুগের একজন দরবেশ— যিনি কলম দিয়ে জাদু করতেন, যিনি গল্পের ভেতর জীবন ঢেলে দিতেন। তিনি ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যিনি প্রমাণ করে গেছেন— “সাহিত্য মানেই জটিলতা নয়, কখনো কখনো সরলরেখার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অনন্ত রহস্য।”

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোণার এক অখ্যাত গ্রামে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটি নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস করে গড়ে তুলেছিলেন এমন এক জগৎ, যেখানে পাঠক হারিয়ে যেতে চায় বারবার। তিনি পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার— কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল মানুষের ভালোবাসা।

আজ তেরো বছর পরেও, আমরা যখন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি, কিংবা হঠাৎ পুরনো প্রেমের কথা মনে পড়ে— তখন আমাদের হাতে থাকে হুমায়ূনের কোনো এক বই, মনে বাজে কোনো সংলাপ— “তোমাকে না, খুব দরকার ছিল…”

তাঁকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, কিন্তু তার সৃষ্টি আছে, তার গল্প আছে— আর আছে এক অদৃশ্য ‘হিমু’র মতোন ভালোবাসা, যা আমাদের গোপনে গোপনে বাঁচিয়ে রাখে।

শ্রদ্ধা হুমায়ূন আহমেদ, আপনি নেই, তবু আছেন… আমাদের প্রতিটি জীবনের ছায়ায়, প্রতিটি নিঃশব্দ ভালোবাসায়।

[লেখাটি উৎসর্গ করা হলো সেইসব পাঠকদের প্রতি, যারা হিমুর হলুদ পাঞ্জাবিতে নিজেকে খুঁজে পান, আর যাদের বুকের ভেতর আজও একটি জায়গা খালি আছে— হুমায়ূন আহমেদ এর জন্য।]

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ