শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পরিবেশবান্ধব শহর গড়ার অঙ্গীকারে বিশ্ব শহর দিবস উদযাপন

(ছবি: গবেষণা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন)

নিজস্ব প্রতিবেদক 

শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বা.স্থ.ই’এর গ্রাউন্ড হলে বিশ্ব শহর দিবসকে কেন্দ্র করে “বাসযোগ্য শহরের জন্য পরিবেশগত স্থায়িত্ব: ঢাকা প্রেক্ষাপট” শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ।

সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য ও গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ও লিডিং ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী আজিজুল মওলা। সেমিনারে আলোচক হিসেবে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক জনাব মো. মাহমুদুর রহমান পাপন এবং সংগঠনটির উপদেষ্টা ও হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা জনাব মো. নাফিজুর রহমান।

সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি জনাব আকতার মাহমুদ এবং বাংলাদেশ পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা, পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ। সেমিনারটির স্পনসর ছিল বি.এস.আর.এম।

সেমিনারের স্পনসর বি.এস.আর.এম-এর পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন প্রকৌশলী জনাব সৌমিত্র কুমার মুৎসুদ্দি। তিনি তার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন নগরীতে পরিবেশ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশের নগর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তা তুলনা করেন। সেই সঙ্গে বি.এস.আর.এম-এর পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডগুলো সেমিনারে উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন এবং জানান, এসব কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে বি.এস.আর.এম “গ্রীন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড” অর্জন করেছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডে বি.এস.আর.এম-এর কমিটমেন্টগুলোর কথাও গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন তিনি।

জনাব মাহমুদুর রহমান পাপন তার উপস্থাপনায় ঢাকাকে একটি সবুজায়ননির্ভর ও টেকসই ল্যান্ডস্কেপ শহর হিসেবে গড়ে তোলার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি নগর কৃষি, কমপ্যাক্ট হাউজিং ও গ্রীন বিল্ডিং ধারণাগুলোর সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেন এবং সবুজায়ন কার্যক্রমে জনগণের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি আরও বলেন, কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ধাপ-নির্ভর পরিকল্পনা ও মনিটরিং ব্যবস্থাপনা।

অন্যদিকে, জনাব নাফিজুর রহমান তার বক্তব্যে সার্কুলার ইকোনমির ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। তিনি নগর পরিবেশ রক্ষায় রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, গ্রীন প্রোডাক্ট এবং রিসাইক্লিং কার্যক্রমের সমন্বিত প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার উপস্থাপনায় রিসাইক্লিংয়ের বিভিন্ন দিক ও সম্ভাবনা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে নির্মাণ খাতে ক্রমবর্ধমান দূষণ নিয়ন্ত্রণে সার্কুলার ইকোনমি একটি কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান হতে পারে।

মূল বক্তা জনাব কাজী আজিজুল মওলা তার বক্তব্যে বলেন, “ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে জনসংখ্যা নয়, বরং জলাবদ্ধতা, দূষণ এবং নগর সেবার অব্যবস্থাপনাই প্রধান বাধা।” তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকার সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা বাড়ি-ভিত্তিক না করে বরং ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা হলে এটি আরও কার্যকর ও টেকসই হবে। তিনি সচিত্র উপস্থাপনার মাধ্যমে নগর সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকনির্দেশনা দেন এবং দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে উদাহরণ তুলে ধরেন। তার তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনায় পরিবেশগতভাবে নগরকে বাসযোগ্য করে তোলার পদ্ধতি, নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের কৌশলসমূহ সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

জনাব আকতার মাহমুদ তার বক্তব্যে বলেন, “ঢাকার জনসংখ্যা সিঙ্গাপুর বা জাপানের মতো নয়; এখানে নগরের আয়তনের তুলনায় মানুষের চাপ অতি মাত্রায় বেশি।” তিনি উল্লেখ করেন, একটি শহরের টেকসই উন্নয়নের জন্য আয়তন ও জনসংখ্যার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে ঢাকার অবকাঠামো ও পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, ফলে শহরটি ধীরে ধীরে তার বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। তিনি বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন ও আঞ্চলিক শহরগুলোর বিকাশের মাধ্যমে রাজধানীমুখী জনসংখ্যার চাপ কমানোর ওপর জোর দেন।

প্রাক্তন সচিব জনাব সুলতান আহমেদ তার বক্তব্যে কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার নানা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাজধানীর সবুজায়ন উপযোগী জমিগুলোকে ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে তাকে নানাভাবে লড়াই করতে হয়েছে। একই সঙ্গে, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব থাকাকালে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের প্রচার ও টেকসই শক্তি উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তিনি শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ঢাকা শহর তার বাসযোগ্যতা হারিয়েছে মূলত ভূমি ব্যবহারের অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন ও পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের কারণে।” তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, নিজ নিজ দায়িত্বে আরও সচেতন ও সহনশীল হয়ে নগর পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য।

পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সভাপতি জনাব এস. এম. খোরশেদ আলম তার বক্তব্যে নগর পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “একটি টেকসই ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পরিবেশবিদ পেশাজীবীদের ভূমিকা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।” তিনি বিশ্ব শহর দিবসের প্রেক্ষাপটে পরিবেশবিদদের প্রতি আহ্বান জানান—তারা যেন তাদের পেশাগত জ্ঞান, গবেষণা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে নগর উন্নয়নে পরিবেশবান্ধব নীতি ও চর্চাকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি আরও বলেন, “পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও সচেতন পেশাচর্চার মাধ্যমেই আমরা একটি সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই নগর গড়ে তুলতে পারি।” তার বক্তব্যে ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বানও প্রতিফলিত হয়।

অনুষ্ঠানে একটি গবেষণাধর্মী বই এবং একটি পরিবেশ পঞ্জিকা প্রকাশ করা হয়, যা নগর পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে ইনস্টিটিউটের চলমান গবেষণা ও উদ্যোগের প্রতিফলন বহন করে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের তৈরি অসংখ্য গবেষণা পোস্টার প্রদর্শিত হয়, যেখানে নগর পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমি ব্যবহার ও সবুজ স্থাপত্যের নানা দিক ফুটে ওঠে।

সেমিনারে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা নগর ও আবাসনভিত্তিক বিভিন্ন নকশা ও পরিকল্পনা প্রকল্প প্রদর্শন করেন। এসব প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য ছিল নগরের বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনাকে জনসাধারণের কাছে সচিত্রভাবে উপস্থাপন করা এবং ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের নতুন ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা।

বিশেষভাবে, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ তাদের একাডেমিক প্রকল্প হিসেবে কামরাঙ্গীরচর এলাকার বর্তমান বাসযোগ্যতা পরিস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী উপস্থাপনা প্রদর্শন করে, যেখানে এলাকাটির সামাজিক, পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত বাস্তবতা সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। দর্শনার্থীরা প্রদর্শনীটি গভীর আগ্রহের সঙ্গে পরিদর্শন করেন এবং তরুণ পেশাজীবীদের এই সৃজনশীল প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করেন।

সেমিনারের কো-স্পনসর ছিল ইকো ফ্রেন্ডলি গ্রীন ব্রিকস লিমিটেড (তিলোত্তমা গ্রুপ), ফেইথ ফাসাদ টেক, হার্মিটেজ অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস লিমিটেড, জি.ই.এম. কনসালট্যান্টস লিমিটেড, রেমো মেশিন টেক। সেমিনারটির মিডিয়া সহযোগী ছিল দৈনিক ইত্তেফাক এবং মুক্ত আকাশ।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সভাপতি জনাব এস. এম. খোরশেদ আলম সকল আলোচক, স্পনসর, কো-স্পনসর, প্রকল্প জমাদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া সহযোগীসহ সেমিনারের কো-অর্ডিনেটর, কো-কো-অর্ডিনেটর এবং মডারেটরের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। পরবর্তীতে তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ