নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার:
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় শীর্ষ খাদ্যভোগী প্রাণী হিসেবে বাঘের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বিগত শতকে পৃথিবীর বাঘসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাঘ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে প্রতি বছর ২৯ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস বা বিশ্ব বাঘ দিবস।
এই দিবসের সূচনা ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈশ্বিক ব্যাঘ্র সম্মেলনের মাধ্যমে। সেখানে ১৩টি বাঘ-বাসভূমি রাষ্ট্রের সরকারসমূহ ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়—যা পরিচিত TX2 লক্ষ্য নামে। যদিও সব দেশে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি, তবুও একাধিক দেশে অগ্রগতির চিত্র আশাব্যঞ্জক।

বর্তমানে বন্য পরিবেশে বাঘের মোট সংখ্যা প্রায় ৫,৫৭৪ (২০২২ সালের আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ—আইইউসিএন-এর হিসাব অনুযায়ী)। এক শতাব্দী আগেও যেখানে প্রায় এক লাখ বাঘ ছিল, সেখান থেকে এই বিপর্যয়কর হ্রাস আমাদের সংরক্ষণ-ব্যর্থতারই প্রতিচ্ছবি।
বাঘের প্রধান আবাসস্থলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, রাশিয়া, চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম। এর মধ্যে ভারত সবচেয়ে বেশি বাঘের আবাসভূমি—সাম্প্রতিক তথ্যে ভারতে রয়েছে প্রায় ৩,১৬৭টি বাঘ (২০২২, অল ইন্ডিয়া টাইগার এস্টিমেশন রিপোর্ট)। নেপাল ও ভুটানেও উল্লেখযোগ্য হারে বাঘ বেড়েছে।
বাংলাদেশে বন্য বাঘ কেবল সুন্দরবনেই পাওয়া যায়। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম শেষ আশ্রয়স্থল। ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০৬টি। তবে আশার কথা, ২০১৮ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতিতে পরিচালিত পরবর্তী জরিপে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪-তে। যদিও সংখ্যা বৃদ্ধি সামান্য, এটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

বাংলাদেশ সরকার বাঘ সংরক্ষণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ টাইগার রিকভারি প্রোগ্রাম, সুন্দরবনের নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাঘের চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা বসানো, বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো, এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বাড়াতে কমিউনিটি প্যাট্রোলিং। তবুও চোরাশিকার, বনভূমি দখল ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ আজও বড় বাধা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ সংরক্ষণের জন্য শুধু বন রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। খাদ্য শৃঙ্খল রক্ষা, বাঘের চলাচলের পথ (কোরিডোর) নিরাপদ রাখা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করাও অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বব্যাপী বাঘ সংরক্ষণে নানা সংস্থা কাজ করছে—বিশ্ব প্রকৃতি তহবিল (WWF), ট্রাফিক, গ্লোবাল টাইগার ফোরামসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। নেপাল, ভুটান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। নেপালে ২০১০ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১২১টি; ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫৫। এই বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কার্যকর নজরদারি, বনের নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে গঠিত ‘কমিউনিটি ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট’।
অন্যদিকে, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লাওসে বাঘ কার্যত বিলুপ্ত। এসব দেশে বন উজাড়, চোরাশিকার এবং চীনা ঐতিহ্যবাহী ওষুধে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহারের প্রবণতা একসময় মারাত্মক ছিল। এই চিত্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সংরক্ষণে সামান্য শৈথিল্যও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি একটি বাস্তুতন্ত্রের সূচক প্রজাতি (indicator species)। যেখানে বাঘ আছে, সেখানকার বন ও জীববৈচিত্র্য সুস্থ আছে—এটি প্রমাণিত সত্য। অর্থাৎ বাঘকে রক্ষা মানে, গোটা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।

আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় যেমন—সেটেলাইট নজরদারি, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ডিএনএ বিশ্লেষণ—সংরক্ষণ কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থায়ন, গবেষণা এবং সর্বোপরি—মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন।
এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যপ্রাণী বিষয়ে পাঠক্রম অন্তর্ভুক্তি, গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম, এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণমূলক কার্যক্রম চালু করাও জরুরি।
বিশ্ব বাঘ দিবস কেবল একদিনের প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি হোক প্রতিজ্ঞার দিন—বাঘকে বিলুপ্তির পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে আমরা সকলে সচেষ্ট হবো। প্রতিটি সংরক্ষিত বাঘ আমাদের জয়। প্রতিটি রক্ষা করা বন আমাদের ভবিষ্যৎ। আর প্রতিটি সচেতন মানুষ এই পৃথিবীর প্রাণের বন্ধনকে আরেকটু দৃঢ় করে।
আজ, ২৯ জুলাই, আসুন আমরা বাঘের গর্জন ফিরিয়ে আনার জন্য একসঙ্গে কাজ করার সংকল্প নেই।








