রবিবার, ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মানুষের চোখের রঙ কালো, নীল, সবুজ ও বাদামী হবার রহস্য

নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার 

মানুষের চোখ পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অঙ্গগুলোর একটি। শুধু দৃষ্টি নয়, আবেগ প্রকাশ, যোগাযোগ কিংবা ব্যক্তিত্বের এক অনন্য প্রতিফলন চোখের মাধ্যমেই ঘটে। গানের ভাষায় “ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি”—চোখের সেই চাহনির ভেতর অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম রহস্য হলো চোখের রঙ। কারও চোখ বাদামি, কারও নীল, কারও সবুজ, আবার কারও চোখে দেখা যায় হালকা হেজেল বা ধূসর আভা। প্রশ্ন হলো—চোখের এই রঙের বৈচিত্র্য কেন হয়? কেন কারও চোখ কালো হয়ে থাকে, আবার কারও চোখে ফুটে ওঠে হিমশীতল নীল বা সবুজ আভা?

চোখের রঙ আসলে জেনেটিকস, আইরিসের গঠন এবং মেলানিন নামক এক বিশেষ পিগমেন্টের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তবে এটি কেবল জৈবিক প্রক্রিয়ার ফল নয়; বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ভেতরে লুকিয়ে আছে মানবজাতির বিবর্তন, ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত প্রভাবের গল্পও।

চোখের রঙ আসলে কী?

চোখের রঙ বলতে আমরা বুঝি আইরিস বা চোখের মণির চারপাশের রঙিন বলয়ের রঙকে। এটি মণিকে ঘিরে রাখা পাতলা কিন্তু জটিল গঠনবিশিষ্ট একটি টিস্যু। আইরিসে উপস্থিত পিগমেন্ট ও এর ভেতর দিয়ে আলো কীভাবে বিচ্ছুরিত হয়, তার ওপর নির্ভর করে চোখে যে রঙ আমরা দেখি।

চোখের রঙ নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখে মেলানিন নামের পিগমেন্ট। আমাদের ত্বক ও চুলের রঙ যেমন মেলানিনের কারণে হয়, তেমনি চোখের রঙও মূলত এই উপাদান নিয়ন্ত্রণ করে।

  • বাদামি চোখ: মেলানিনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। ফলে বেশি আলো শোষিত হয়, আর চোখ গাঢ় বাদামি বা কালো দেখায়।
  • নীল চোখ: এখানে মেলানিনের উপস্থিতি খুবই কম। আসলে নীল কোনো পিগমেন্ট নেই; আলোর বিচ্ছুরণ (Rayleigh scattering) আইরিসকে নীল আভা দেয়, যেমন আকাশ নীল দেখায়।
  • সবুজ চোখ: মাঝারি মাত্রার মেলানিন ও আলোর প্রতিফলনের ভারসাম্য সবুজ রঙ তৈরি করে।
  • হেজেল চোখ: অসম মেলানিন বণ্টন ও আলো প্রতিফলনের কারণে চোখ কখনও বাদামি, কখনও সবুজ বা সোনালি আভা ধারণ করে।

জেনেটিকসের ভূমিকা

বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন চোখের রঙ একটি জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ একটি প্রধান জিন নির্ধারণ করে কার চোখ বাদামি হবে, কার নীল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে—চোখের রঙ নির্ধারণে কমপক্ষে ১৬টিরও বেশি জিন একসঙ্গে কাজ করে। এর মানে হলো—একই বাবা-মায়ের সন্তানদের চোখের রঙ ভিন্ন হতে পারে।

  • উদাহরণস্বরূপ: দুই নীল চোখের বাবা-মায়ের সন্তান সবুজ কিংবা বাদামি চোখেরও হতে পারে, যদিও সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
  • ভাইবোনের ভিন্ন চোখের রঙ: একাধিক জিনের সমন্বয়ের কারণে ভাইবোনদের চোখের রঙে বৈচিত্র্য দেখা যায়।

এই জিনগুলো মূলত মেলানিন উৎপাদনের মাত্রা ও বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য কারও চোখ গাঢ় বাদামি, আবার কারও চোখ হালকা নীল বা সবুজ হয়।

জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক: চোখের রঙের পরিবর্তন

শিশুরা জন্মের সময় যে চোখ নিয়ে জন্মায়, সেটি সবসময় স্থায়ী নয়। বিশেষ করে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত শিশুদের অনেকেই জন্মের সময় নীল বা ধূসর চোখ নিয়ে জন্মায়।

কারণ হলো—জন্মের সময় তাদের আইরিসে মেলানিন খুব কম থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে মেলানিন জমা হতে থাকে। এর ফলে নীল চোখ সবুজ, হেজেল বা বাদামি রঙে পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারণত দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে শিশুদের চোখের রঙ স্থায়ী হয়।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ক্ষেত্রে জন্ম থেকেই চোখ কালো বা গাঢ় বাদামি হয়ে থাকে, কারণ আমাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মেলানিনের ঘনত্ব বেশি থাকে।

চোখের রঙের বৈশ্বিক বিস্তার

বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে চোখের রঙের বণ্টন সমান নয়।

  • পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের চোখ বাদামি বা কালো।
  • নীল চোখ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় উত্তর ও পূর্ব ইউরোপে। যেমন এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড বা লিথুয়ানিয়ায় প্রায় ৮০-৯০% মানুষের চোখ নীল।
  • সবুজ চোখ তুলনামূলক বিরল। পৃথিবীর মাত্র ২% মানুষের চোখ সবুজ, যা প্রধানত কেল্টিক বা উত্তর ইউরোপীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে দেখা যায়।
  • হেজেল চোখ মধ্য ইউরোপ, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে তুলনামূলক বেশি।

এ থেকে বোঝা যায়—চোখের রঙ শুধু জেনেটিক নয়, মানবজাতির ভৌগোলিক অভিযোজন ও বিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বিবর্তন ও পরিবেশগত প্রভাব

গবেষকরা মনে করেন, প্রাচীন মানুষদের সবার চোখই বাদামি ছিল। প্রায় ৬ থেকে ১০ হাজার বছর আগে ইউরোপ অঞ্চলে জিনগত এক মিউটেশনের মাধ্যমে নীল চোখের উৎপত্তি হয়। এরপর ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়ে।

চোখের রঙ আসলে পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের ফল। গাঢ় বাদামি চোখ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ভালো সুরক্ষা দেয়। এজন্য বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলের মানুষদের চোখ সাধারণত বাদামি বা কালো। অন্যদিকে, ইউরোপের উত্তরে সূর্যের তেজ কম হওয়ায় হালকা চোখের মানুষ টিকে থাকতে পেরেছে।

চোখের রঙ ও ব্যক্তিত্ব: বিজ্ঞান নাকি মিথ?

চোখের রঙ নিয়ে নানা বিশ্বাস রয়েছে। কেউ বলেন, নীল চোখ মানেই কোমল স্বভাব, বাদামি চোখ মানেই দৃঢ় ব্যক্তিত্ব। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে চোখের রঙ ও ব্যক্তিত্বের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি। যদিও কিছু গবেষণা ইঙ্গিত করে যে মেলানিন স্নায়ুতন্ত্রের কাজেও ভূমিকা রাখে, ফলে বাদামি চোখের মানুষদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। তবে এসব এখনো বিতর্কিত ক্ষেত্র।

চোখের রঙ স্থির নয়

চোখের রঙকে বিজ্ঞানীরা গতিশীল বৈশিষ্ট্য মনে করেন। কারণ আলো, কোণ, পরিবেশ কিংবা পোশাকের রঙের ওপর নির্ভর করে চোখের রঙ ভিন্নভাবে প্রতীয়মান হতে পারে। যেমন—

  • বাদামি চোখে সোনালি আভা ফুটে উঠতে পারে,
  • নীল চোখ কখনও ধূসর–নীল দেখাতে পারে,
  • হেজেল চোখে আলো পড়লে সবুজাভ আন্ডারটোন তৈরি হতে পারে।

এটি আসলে আইরিসের গঠন ও আলো প্রতিফলনের জটিল মিথস্ক্রিয়ার ফল।

চিকিৎসা ও কৃত্রিম পরিবর্তন

বর্তমানে প্রযুক্তির কারণে মানুষ চোখের রঙ পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। কন্টাক্ট লেন্সের মাধ্যমে অস্থায়ীভাবে চোখের রঙ পরিবর্তন সম্ভব। আবার কিছু দেশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে চোখের রঙ বদলানোর পরীক্ষাও চলছে। তবে এসব পদ্ধতির ঝুঁকি অনেক বেশি—চোখের ক্ষতি, দৃষ্টি কমে যাওয়া বা অন্ধত্ব পর্যন্ত ঘটতে পারে।

চোখের রঙ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এর ভেতর লুকিয়ে আছে মানবজাতির বিবর্তন, জেনেটিক বৈচিত্র্য ও পরিবেশ অভিযোজনের বিস্ময়কর কাহিনি। বাদামি থেকে নীল, সবুজ থেকে হেজেল—প্রতিটি রঙই একেকটি গল্প বলে।

আমরা যখন কারও চোখের দিকে তাকাই, তখন কেবল একজোড়া চোখ নয়—হাজার বছরের জেনেটিক ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক রহস্য আর প্রকৃতির জটিল সৌন্দর্যও একসঙ্গে দেখি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ