শনিবার, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মেয়েলী স্বাস্থ্য: লজ্জা নয়, জানতে হবে

সায়ন্তনী সেন, পথে প্রান্তরে   

“হঠাৎ স্কুলে বসে টিফিন সময় আমার সাদা পোশাক লাল হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম কিছু একটা খারাপ হয়েছে। বন্ধুরা হাসাহাসি শুরু করল, আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। বাড়ি ফিরে মা’কে জানলাম। তখন জানলাম আমার মাসিক শুরু হয়েছে। কিন্তু তখনও বুঝতে পারছিলাম না—এটা আসলে কী?”   — কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার এক স্কুল ছাত্রী।

এমন পরিস্থিতির শিকার তিনি একা নন, আমাদের চারপাশে অসংখ্য কিশোরী মেয়ে এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বড় হয়। কারণ পরিবারে, স্কুলে বা সমাজে তাদের আগে থেকে কেউ এসব বিষয়ে সঠিক তথ্য দেয় না। নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনো আমাদের কাছে “লজ্জার” বিষয়। অথচ সত্য হলো, নারীর জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন ঘটে এবং সেই পরিবর্তন বোঝা ও মানিয়ে নেওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার।

নারীর স্বাস্থ্য মানেই কেবল অসুস্থ হলে চিকিৎসা নয়, বরং শারীরিক ও মানসিক সব দিক থেকেই পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য, মাসিক, মাতৃত্ব কিংবা মেনোপজ নিয়ে আলোচনা গোপন রাখা হয়। এই নীরবতা শুধু অজ্ঞতাই নয়, অসংখ্য স্বাস্থ্য সমস্যার জন্ম দেয়। তাই এখনই দরকার সচেতনতার, আর দরকার সাহস নিয়ে লজ্জার দেয়াল ভেঙে সামনে এগিয়ে আসার।

কৈশোরের প্রথম ধাক্কা

বাংলাদেশের অনেক পরিবারেই মেয়েদের প্রথম মাসিক হওয়ার আগে কোনো ধারণা দেওয়া হয় না। ফলে হঠাৎ রক্তপাত শুরু হলে তারা ভয় পেয়ে যায়, মনে করে শরীরে বড় অসুখ হয়েছে। গ্রামের এক জনৈক কিশোরী জানাল, মাসিক শুরু হলে মা তাকে আলাদা ঘরে থাকতে বলেছিলেন। পরিবারের অন্যরা তাকে ‘অশুচি’ বলায় সে কয়েকদিন কাউকে মুখ দেখায়নি। অথচ যদি আগে থেকে বোঝানো হতো, তবে এত মানসিক আঘাত পেতে হতো না।

কৈশোরকাল হলো শরীরে পরিবর্তনের সময়। এই বয়সে হরমোনগত কারণে শারীরিক ও মানসিক ওঠানামা স্বাভাবিক। কিন্তু সচেতনতার অভাবে কিশোরীরা অপরাধবোধে ভোগে, পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে, এমনকি আত্মবিশ্বাসও হারায়। স্কুলে অনেক মেয়ে মাসিকের দিনগুলোতে অনুপস্থিত থাকে কারণ তারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করতে পারে না বা এ নিয়ে লজ্জা বোধ করে।

মাসিক স্বাস্থ্য ও অজস্র কুসংস্কার

আমাদের সমাজে মাসিককে এখনো অস্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কেউ সরাসরি বলতে চায় না, নামের পরিবর্তে গোপন সংকেত ব্যবহার করে। অনেক পরিবারে এ সময় মেয়েদের আলাদা রাখা হয়, কিছু খাবার খেতে দেওয়া হয় না। ঢাকার এক গৃহবধূ জানালেন, “আমাকে মাসিকের সময় গরুর দুধ খেতে দেওয়া হতো না, বলা হতো শরীর খারাপ হয়ে যাবে।” এ ধরনের বিশ্বাসগুলো কেবল কুসংস্কার, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

অপরদিকে, স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এখনও অনেক মেয়ে পুরনো কাপড় ব্যবহার করে, সেটিও ঠিকমতো পরিষ্কার না করে। এর ফলে যোনি সংক্রমণ, চুলকানি, এমনকি ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করা গেলে সবচেয়ে ভালো। তবে আর্থিক কারণে যদি তা সম্ভব না হয়, তবে পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করতে হবে এবং সেটি নিয়মিত ধুয়ে রোদে শুকাতে হবে।

লজ্জা লুকোচুরির মাশুল

নারীরা শুধু মাসিক নয়, অনেক গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যাও লজ্জার কারণে গোপন করে রাখেন। কুমিল্লার গৃহবধূ হাসিনা তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন, “প্রথম সন্তান হওয়ার পর থেকে শরীরে নানা সমস্যা শুরু হয়। কিন্তু কাউকে বলতে লজ্জা লাগত। ডাক্তার দেখাইনি। পরে অবস্থা এত খারাপ হলো যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো।”

এমন ঘটনা অসংখ্য। যোনির ইনফেকশন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, স্তন বা জরায়ুর টিউমার—এসব সমস্যা নারীরা পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেন না, লুকিয়ে রাখেন। ফলস্বরূপ, রোগ ধীরে ধীরে মারাত্মক আকার ধারণ করে। যদি সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া যেত, তবে হয়তো বিপদ এড়ানো সম্ভব হতো।

প্রজনন স্বাস্থ্য: জীবনধারার সঙ্গে জড়িত

নারীর জীবনে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্ম এক বড় পরিবর্তন। এ সময় শরীর দুর্বল হয়ে যায়, রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়, মানসিক চাপও বেড়ে যায়। অথচ গ্রামের অনেক নারী এখনো প্রসবকালীন ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতেই সন্তান জন্ম দেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সামাজিক ভয়ে বা পরিবারের অনুমতি না থাকায় তা ব্যবহার করতে পারেন না।

একজন মা বলছিলেন, “আমার দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার সময় কিছু জটিলতা অনুভব করার কারণে ডাক্তার দেখাতে চেয়েছিলাম। শ্বশুরবাড়ির সবাই বলল, এসব বাইরে বলা যাবে না, লজ্জার বিষয়। শেষ পর্যন্ত বাড়িতেই প্রসব করি, আর তাতেই মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয়।” এই ধরনের অজ্ঞতা এবং সামাজিক চাপ প্রতি বছর অসংখ্য নারীকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

মেনোপজ: উপেক্ষিত অধ্যায়

৪৫–৫০ বছর বয়সের মধ্যে নারীদের মাসিক বন্ধ হয়ে যায়, যাকে মেনোপজ বলা হয়। এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। ফলে হাড়ক্ষয়, গরমে ঘাম হওয়া, মানসিক অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি দেখা দেয়। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়েও সমাজে আলোচনা নেই। অনেক নারীই জানেন না তাদের শরীরে কী ঘটছে। ফলে তারা উদ্বেগে ভোগেন, একাকিত্বে ডুবে যান।

ডাক্তারদের মতে, এ সময় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হরমোনজনিত চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নেওয়া জরুরি। কিন্তু যেহেতু নারীরা এসব প্রকাশ করতে লজ্জা পান, তাই সমস্যাগুলো অজান্তেই বড় আকার নেয়।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময়

নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই বড় বাধা। এখনো অনেকে মনে করেন এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা অশোভন। অথচ ছেলে-মেয়ে উভয়েরই জানা উচিত নারীর শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কে। পরিবারের মধ্যে বাবা বা ভাইরা যদি বিষয়গুলো বুঝতে পারেন, তবে মেয়েরা স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের সমস্যার কথা বলতে পারবেন।

গণমাধ্যমে প্রচার, স্কুল-কলেজে পাঠ্যসূচি এবং চিকিৎসকদের উদ্যোগ—সবই জরুরি। ইতিমধ্যে কিছু এনজিও গ্রামে-গঞ্জে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালা চালু করেছে। এক স্কুলশিক্ষিকা জানালেন, “প্রথমে অভিভাবকরা আমাদের বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করলে সবাই বুঝলেন এর প্রয়োজনীয়তা।” আজ সেই গ্রামে মাসিক নিয়ে আগের মতো কুসংস্কার আর নেই।

স্বাস্থ্য সচেতনতা মানেই শক্তি

নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু চিকিৎসা নয়, জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন দরকার। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ কমানো—এসব অভ্যাস নারীর শরীর ও মনকে সুস্থ রাখে। অনেক সময় গৃহস্থালির কাজে বা সংসারের দায়িত্বে নারীরা নিজেদের খাবার বা বিশ্রামকে গুরুত্ব দেন না। অথচ তাদের সুস্থতা পুরো পরিবারের জন্য জরুরি।

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বললেন, “আমি আগে খুব অসুস্থ হয়ে পড়তাম মাসিকের সময়। পরে ডাক্তার বললেন বেশি পানি খেতে, ফলমূল খেতে আর ঘুম ঠিক রাখতে। কয়েক মাসেই অনেক পরিবর্তন টের পেয়েছি।” ছোটখাটো এই অভ্যাসগুলো বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

শেষকথা

নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে চুপ থাকার সময় শেষ। লজ্জা নয়, সচেতনতা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে—নারীর সুস্থতা মানে কেবল একজন মানুষের নয়, পুরো পরিবারের, পুরো সমাজের সুস্থতা।

একজন মা যদি সুস্থ থাকেন, তিনি সন্তানকে সুস্থভাবে বড় করতে পারবেন। একজন কিশোরী যদি মাসিক নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে পারে, তবে সে পড়াশোনা ও জীবনে এগিয়ে যাবে। একজন নারী যদি মেনোপজ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন, তবে তিনি একা নন—এটা বুঝতে পারবেন।

তাই আসুন, লজ্জার দেয়াল ভেঙে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি করি। স্কুলে, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে—সর্বত্র নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে আলাপ স্বাভাবিক হোক। কারণ—সুস্থ নারী মানেই সুস্থ সমাজ, আর সুস্থ সমাজই পারে একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ