নাসরিন সুলতানা, স্টাফ রিপোর্টার
ফারদিনের বয়স মাত্র ছয়। এই বয়সে যেখানে তার আনন্দে স্কুলে ছুটে যাওয়ার কথা, মাঠে ঘাম ঝরিয়ে খেলার কথা, সেখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ইনসুলিন নেওয়াই হয়ে উঠেছে তার জীবনের নিয়ম। ছেলেটির বাবা আহমেদ এলাহী যখন প্রথম লক্ষ্য করলেন, ফারদিন ঘন ঘন প্রস্রাবে যাচ্ছে, শরীর অস্বাভাবিক দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখনই তিনি চিকিৎসকের কাছে যান। রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে টাইপ–১ ডায়াবেটিস। এরপর থেকে ইনসুলিন ছাড়া একদিনও বাঁচা সম্ভব নয় ফারদিনের।
এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট বোঝার জন্য যে, ডায়াবেটিস এখন আর কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ নয়। শিশুদের মাঝেও এর প্রকোপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। যদিও সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারও হাতে, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির তথ্য বলছে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ শিশু নতুন করে ডায়াবেটিস রোগী হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। এ সংখ্যা গত দশক বা তারও আগে সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিসকে সাধারণত আমরা দুই ভাগে ভাগ করি—টাইপ-১ এবং টাইপ-২। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সীদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস হয়। এ ধরনের রোগীদের আজীবন ইনসুলিন নিতে হয়। আর টাইপ-২ ডায়াবেটিস ছিল মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনকভাবে তা শিশু-কিশোরদের মধ্যেও দেখা দিচ্ছে। একসময় যে রোগ ধরা পড়ত চল্লিশের পরে, এখন সেটি ধরা পড়ছে কিশোর বয়সেই।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বাকালীন ডায়াবেটিসের হার ৬ থেকে ১৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে ভবিষ্যতে মায়ের পাশাপাশি সন্তানেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনকি এ ধরনের মায়েদের অর্ধেকেরও বেশি পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। শিশুরাও ঝুঁকির মুখে পড়ে জন্ম থেকেই।
চিকিৎসকরা মনে করেন, টাইপ-১ ডায়াবেটিস মূলত জেনেটিক ও ইমিউন সিস্টেম–সংক্রান্ত। দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ ধ্বংস করে ফেলে, ফলে শরীর ইনসুলিন উৎপাদনের ক্ষমতা হারায়। শিশুর জীবনের বাকি সময় জুড়েই তাই ইনসুলিনের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও টাইপ-২ ডায়াবেটিস এখন কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও বাড়ছে, যা উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ডোক্রাইনলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিমের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, চীন বর্তমানে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শিশু ও কিশোরদের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আধুনিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। শিশুদের মধ্যে ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা ভয়ংকর হারে বাড়ছে। ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, চিপস, ভাজাপোড়া খাবার, চকোলেট ইত্যাদি তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ভিডিও গেমস ও কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানোয় কায়িক পরিশ্রম বা খেলাধুলা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে কম বয়সেই তাদের দেহে চর্বি জমে স্থূলতা বাড়ছে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিস ধরা পড়ে গড়ে ৩৭ বছর বয়সের পরে। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে অল্প বয়সেই কিশোররা আক্রান্ত হচ্ছে। এটি অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রায় ৭০ শতাংশই আসলে প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু তার জন্য দরকার সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা। শৈশব থেকেই শিশুকে স্বাস্থ্যকর জীবনে অভ্যস্ত না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ইনসুলিন ছাড়া টাইপ-১ রোগীদের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, তবে ইনসুলিন নিয়েই তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া। অতীতে ৩০ বছরের আগে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের নজির ছিল বিরল। এখন ১৫–১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়েই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা মারাত্মক। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। আর চলমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটি ২৩ লাখে। অর্থাৎ এখন যা আছে, ভবিষ্যতে তা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। এর পেছনে বড় কারণ মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ফাস্টফুড সংস্কৃতি ও শরীরচর্চার অভাব।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট থেকে বেরোনোর উপায় কী? চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শিশুদের শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত করা। ঘরে তৈরি খাবারের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়াতে হবে। কোমল পানীয়, চিপস, ভাজা খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বর্জন করতে হবে। প্রতিদিন নিয়মিত খেলাধুলা ও কায়িক পরিশ্রমের সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবার থেকে যদি সচেতনতা শুরু হয়, তবে শিশুরা ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে স্কুলেও স্বাস্থ্যশিক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন। অনেক অভিভাবক ভাবেন, পড়াশোনা ভালো হলেই বাকি কিছু যায় আসে না। ফলে বাচ্চারা সারাদিন বইয়ের পেছনে, আর শরীরচর্চার কোনো সুযোগ নেই। অথচ সুস্থ দেহ না থাকলে মেধাও কাজে লাগে না। তাই প্রতিটি স্কুলে খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।

ডায়াবেটিস কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও আর্থিক চাপও সৃষ্টি করে। ছোট একটি শিশুর প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হচ্ছে, পরিবারকে সেটি জোগাড় করতে হচ্ছে। চিকিৎসা, নিয়মিত টেস্ট, ওষুধ—সব মিলিয়ে এ ব্যয় অনেকের জন্যই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এটি একপ্রকার জীবনযুদ্ধ।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, শিশুদের ডায়াবেটিস এখন এক গভীর উদ্বেগের বিষয়। একদিকে জেনেটিক বা জন্মগত কারণ, অন্যদিকে জীবনযাত্রার আধুনিকতা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে হলে আজ থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা, সঠিক তথ্য, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং নিয়মিত শরীরচর্চাই হতে পারে শিশুদের ডায়াবেটিস প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায়।
আজ যে শিশুটি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে ইনসুলিনের ওপর নির্ভর করছে, কাল তার মতো আরও শত শত শিশু যোগ হতে পারে। আর যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করছে এক নিঃশব্দ মহামারি।








