আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য কি পাকিস্তান?
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার নতুন পর্ব শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি গোটা অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। পশ্চিমা কয়েকটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও গণমাধ্যম ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছে—এই সংঘাতের পরবর্তী কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে পাকিস্তান।
বিস্তৃত যুদ্ধের আশঙ্কা
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জেফ্রি শ্যাক্স প্রশ্ন তুলেছেন, “ইসরায়েল-ইরান সংঘর্ষের নতুন দফা শুরুর পর আমরা কি আরও বিস্তৃত এক আঞ্চলিক যুদ্ধের মুখোমুখি?” বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও আধুনিক যুদ্ধের পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি জটিল থেকে আরও জটিল হয়ে উঠছে। এখনকার যুদ্ধ শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শনী নয়—এতে যুক্ত হয়েছে ড্রোন, সাইবার অপারেশন, এজেন্ট মোতায়েনের মতো উচ্চপ্রযুক্তি নির্ভর কৌশল।
সম্প্রতি দুটি আলোচিত অভিযান হলো ইউক্রেনের ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েব’ এবং ইসরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’। ইউক্রেন তার অভিযানে ধ্বংস করেছে ৪০টির বেশি কৌশলগত বোমারু বিমান। আর ইসরায়েল ইরানে প্রবেশ করে হত্যা করেছে পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের। টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানে একটি গোপন ড্রোন ঘাঁটি স্থাপন করেছিল, এমনকি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য পাঠিয়েছিল সশস্ত্র কমান্ডোও।
পাকিস্তান কেন আলোচনায়?
ইসরায়েলের সাবেক ও বর্তমান রাজনীতিবিদ এবং পশ্চিমা বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানকে ‘অস্থিতিশীল রাষ্ট্র’ ও ‘পারমাণবিক হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুটি ইসলামপন্থী চরমপন্থী রাষ্ট্রকে পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া থেকে বিরত রাখা—ইরান ও পাকিস্তান।”
১৯৮১ সালে ইরাকের পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংসের পর থেকেই পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ইসরায়েল। তখন থেকেই পশ্চিমা গণমাধ্যমে ‘ইসলামিক বোমা’ শব্দটি ভয় দেখানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ কখনো শোনা যায়নি ‘ইহুদি বোমা’ কিংবা ‘খ্রিস্টান বোমা’ শব্দ।
পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি ও ভীতি
‘অ্যাস্পেন আইডিয়াস ফেস্টিভ্যাল’-এ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ চেয়্যারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেনকে প্রশ্ন করা হয়, “ইরান নাকি পাকিস্তান—কে বড় হুমকি?” উত্তরে তিনি বলেন, “সম্ভবত পাকিস্তান।” এর পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা বহুদিন ধরেই পশ্চিমা বিশ্বে প্রচলিত।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের একটি প্রতিবেদনে (“The Agonizing Problem of Pakistan’s Nukes”) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
পাকিস্তান কি পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র?
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়, তবে পাকিস্তান হতে পারে পরবর্তী লক্ষ্য। কারণ যুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ব্যবসাও। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা বাড়লে এই ব্যবসায় লাভ আরও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ভারত হয়তো পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ব্যবহার করে সীমিত ড্রোন হামলা কিংবা স্মার্ট অভিযান চালাতে পারে—যেমন ইউক্রেন করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে, কিংবা ইসরায়েল করেছে ইরানে।
ভারত-ইসরায়েল জোটের উগ্র অবস্থান
ভারত ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব—নরেন্দ্র মোদি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—দুজনেই উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক। উভয়ের নেতৃত্বে ধর্মীয় সংখ্যাগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও বৃহত্তর রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন এই অঞ্চলকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
পুরনো কৌশল, নতুন লক্ষ্য?
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, পশ্চিমা মিডিয়া আবারও সেই পুরনো কৌশলই ফিরিয়ে এনেছে—“যেকোনো মুসলিম দেশকে ধ্বংস করতে হলে আগে তাকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করো।” সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন, লেবানন, সুদান এবং ইরানের পর কি এবার টার্গেট পাকিস্তান?
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বেলুচিস্তানভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘বেলুচ লিবারেশন আর্মি’ বহুদিন ধরেই সক্রিয়। এই গোষ্ঠীর মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা ছড়ানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অধ্যাপক সুশান্ত সিং সতর্ক করে বলেছেন, “দক্ষিণ এশিয়ায় হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলিমবিরোধী উস্কানি ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।”
জনগণের বার্তা: যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই
যদিও নেতারা যুদ্ধের পথে হাঁটছেন, জনগণ চাইছে শান্তি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আটলান্টিকের তথ্য অনুযায়ী, ৭০ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিকই চান নেতানিয়াহুর পদত্যাগ। এশিয়া টাইমস বলছে, ভারতের অনেক নাগরিক মোদির ‘ঘৃণার রাজনীতি’তে বিরক্ত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদি ও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দক্ষিণ ও মধ্যপ্রাচ্যে যে হুমকিস্বরূপ উগ্র কৌশল চালু হয়েছে, তা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল, ডেইলি সাবাহ, আটলান্টিক, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন, এশিয়া টাইমস।








