সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গাজা হারালো এক বন্ধুকে: পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া

গাজা হারালো এক বন্ধুকে: পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া

পোপ ফ্রান্সিস আর নেই। ধর্ম, জাতি বা ভূখণ্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে, সারা বিশ্বের মানুষ আজ শোক প্রকাশ করছে এক মহান হৃদয়ের মানুষের মৃত্যুতে। যিনি কেবল রোমান ক্যাথলিক চার্চের নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন মানবতাবাদী, যিনি ন্যায়, শান্তি ও সহানুভূতির বার্তা ছড়িয়ে গেছেন বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও গাজার প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন আজ যেন আরও বেশি করে আলোচনায় উঠে এসেছে।

৮৮ বছর বয়সে, ডাবল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায়, গত সোমবার তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অথচ ঠিক আগের দিন, Easter Sunday-তে, তিনি খোলা পোপমোবাইলে করে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে হাজারো মানুষের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাই তার মৃত্যু যেন এক আকস্মিক ধাক্কার মতো এসে আঘাত করল পৃথিবীর বিবেকবান মানুষদেরকে।

শেষ ভাষণে গাজার কথা
তার Easter Sunday-র বার্তায় উঠে আসে মানবতা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতার প্রতিধ্বনি। তিনি বলেন, “আমি ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি জনগণের দুঃখ-কষ্টের পাশে আছি। আমি সকল পক্ষকে আহ্বান জানাই—যুদ্ধ থামান, বন্দিদের মুক্তি দিন এবং এই ক্ষুধার্ত, ভীত, শান্তির স্বপ্ন দেখা মানুষদের পাশে দাঁড়ান।”
তিনি কেবল গাজার কথাই বলেননি, ইউক্রেন, সুদান, ইয়েমেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের কথাও তুলেছিলেন তাঁর বার্তায়। তিনি বিশ্ব নেতাদের আহ্বান জানান, “ভয়ের রাজনীতিতে বিশ্বাস কোরো না। যা কেবল বিচ্ছিন্নতাই বাড়ায়।”
তিনি আরো বলেন, “আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই—যেসব স্থাপনায় বোমা পড়ে, সেগুলো কেবল ভবন নয়; ওগুলোতে মানুষ থাকে, যাদের প্রত্যেকেরই আছে আত্মা ও সম্মান।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এই যুদ্ধ শুধু যুদ্ধ নয়, এটা নিষ্ঠুরতা।”

‘গাজা হারিয়েছে একজন প্রকৃত বন্ধু’
পোপের মৃত্যুতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শোকবার্তা আসছে। পাকিস্তানি লেখক ও মানবাধিকারকর্মী ফাতিমা ভুট্টো বলেন, “পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন আমাদের শেষ ভরসার কণ্ঠস্বর। এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিদিন গাজার চার্চে ফোন করে খোঁজ নিতেন। তিনি ছিলেন নির্ভীক, সদা সহানুভূতিশীল। আমি তাকে ভালোবাসতাম এবং তার জন্য প্রার্থনা করব।”

ফাতিমা ভুট্টো যে চার্চের কথা বলেছেন, সেটি হলো গাজার রোমান ক্যাথলিক চার্চ ‘চার্চ অব দ্য হলি ফ্যামিলি’। এর যাজক গ্যাব্রিয়েল রোমানেল্লি বলেন, “পোপ ফ্রান্সিস প্রতিদিন রাত ৮টায়, এমনকি হাসপাতালের বেড থেকে আমাকে ফোন করতেন। তিনি গাজার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।”

বেথলেহেমের প্যালেস্টিনীয় যাজক মুন্থের আইজাক বলেন, “আজ ফিলিস্তিনের খ্রিস্টানরা এক প্রিয়জনকে হারাল। পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন আমাদের প্রকৃত বন্ধু। তার যাজকসুলভ হৃদয় স্পষ্ট ছিল তার প্রতিটি কাজ ও আহ্বানে।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও পোপের মৃত্যুতে ছিল একই সুর। এক ব্যক্তি লিখেছেন, “আমি নাস্তিক, কিন্তু পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু আমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। তিনি ভালোবাসার, মানবতার, ও মুক্তির প্রতীক ছিলেন।”

অন্য একজন বলেন, “যখন বিশ্বের অনেক নেতা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াতে ভয় পায়, তখন পোপ ফ্রান্সিস অকুতোভয়ে গাজার জন্য আওয়াজ তুলেছেন।”

ভারতীয় সাংবাদিক রানা আয়্যুব লেখেন, “তিনি ছিলেন সেই ধর্মযাজক, যিনি গাজাকে প্রার্থনায় এবং সুদানকে হৃদয়ে ধরে রাখতেন। শেষ দিনগুলোতেও তিনি কথা বলেছেন নিপীড়িতদের হয়ে—ভাঙা মানুষদের হয়ে, বিস্মৃত মানুষের হয়ে।”

আরেকজন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী লেখেন, “তিনি মৃত্যুর আগেই বলে গেছেন, ‘এটা যুদ্ধ নয়, এটা নিষ্ঠুরতা।’ তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি বোমার নিচে মারা যাওয়া শিশুদের জন্য কাঁদতেন, ধ্বংস হওয়া পরিবারের জন্য কথা বলতেন। তিনি ছিলেন এমন একজন ধর্মীয় নেতা, যিনি ইসরায়েলের গাজায় আক্রমণকে নিঃসঙ্কোচে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলেছেন। এই সাহস আর দেখা যায় না আজকাল।”

একটি আলোর প্রদীপ নিভে গেল
পোপ ফ্রান্সিস হয়তো আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর, তার বার্তা, তার দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছু আজও প্রাসঙ্গিক। এই ঘোর অমানিশায়, তাঁর মতো মানুষদের কণ্ঠ আরও দরকার ছিল আমাদের। শেষ ভাষণে তিনি বলেন, “শান্তি কখনোই আসবে না যদি না থাকে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান।”

এই কথাগুলোর প্রতিধ্বনি যেন আজ বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
পোপ ফ্রান্সিস চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন সহানুভূতির বাতিঘর। আজকের এই সংকটময় সময়ে, তার মতো সাহসী ও মানবিক কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আমাদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ