অনলাইন ডেস্ক:
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং সম্প্রতি তিব্বতের মালভূমিতে একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্নপ্রবাহে নির্মিতব্য এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রকল্পে রূপ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটি ঘিরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানি সরবরাহ ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, তিব্বতের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ন্যিংচি শহরে এই মেগা বাঁধ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন লি কিয়াং। এই ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত পেরিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসাম দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নামে। বিশাল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
২০২০ সালে বেইজিং তাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রথম এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। প্রকল্পটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ধরা হয়েছে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা—যা বিশ্ববিখ্যাত থ্রি জর্জেস বাঁধের তিনগুণ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি নদীর নিম্নপ্রবাহের দেশগুলোর—বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশের—পানি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, চীন এই প্রকল্পকে ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তারা মনে করেন, বাঁধটির মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বন্যা বা খরার সৃষ্টি করার মতো কৌশলগত পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে বেইজিং। তবে চীন দাবি করছে, প্রকল্পটি পরিবেশ, পানির ন্যায্য ব্যবহার এবং প্রতিবেশী দেশের স্বার্থের প্রতি সম্পূর্ণ সম্মান রেখে, প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি শুধুই চীনের জন্য মুনাফার উৎস নয়, বরং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশমনের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এই বাঁধ নির্মাণের প্রতিক্রিয়ায় ভারত ব্রহ্মপুত্র নদে নিজস্ব জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে, যাতে পানি অধিকার রক্ষায় পিছিয়ে না পড়ে। অরুণাচল প্রদেশকে ঘিরে ভারত ও চীনের ভূখণ্ডগত বিরোধও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চীন অঞ্চলটিকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে, যেখানে ভারতের অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং।
সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের এই মেগা প্রকল্পে পাঁচটি ক্যাসকেড জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে এবং এতে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (১৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করা হবে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুধু তিব্বতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা নয়, বহিরাগত ব্যবহারেও কাজে লাগানো হবে।
প্রকল্পটি তত্ত্বাবধানের জন্য ‘চায়না ইয়াজিয়াং গ্রুপ’ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ঝাং গোছিং বলেন, প্রকল্পটি যাতে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে বাস্তবায়িত হয়, সে লক্ষ্যেই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট








