শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা, নিহত শতাধিক

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরায়েলের হামলা, নিহত শতাধিক

গাজার শান্তিপ্রত্যাশী জনগণ যখন যুদ্ধবিরতির স্বস্তিতে ঘুমিয়ে ছিল, তখনই শুরু হয় একের পর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মধ্যরাতের পর ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার বিমান হামলায় চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ হতাহত হয় এই হামলায়। রাতের অন্ধকারে রক্তাক্ত মানুষদের আর্তনাদে কেঁপে ওঠে গাজা উপত্যকা।

১৫ মাসের অবিরাম সহিংসতার পর যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কিছুটা শান্তির আশা দেখছিল গাজার মানুষ। কিন্তু সেই স্বস্তিকে নিঃশেষ করে দিয়ে ইসরায়েল নতুন করে আক্রমণ শুরু করেছে। সোমবার মধ্যরাতের পর চালানো হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০৪ ফিলিস্তিনির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া আহত হয়েছেন ৫৬২ জনেরও বেশি, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

খান ইউনিস, রাফা, গাজা নগরী এবং দেইর আল-বালাহসহ পুরো গাজায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির—কোনো স্থানই রক্ষা পায়নি এই হামলার হাত থেকে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে নিরীহ মানুষদের ওপর এই বর্বরতা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনগুলো।

গাজার প্রধান প্রতিরোধ সংগঠন হামাস ইসরায়েলের এই হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর সরব হওয়া উচিত। তারা আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়।

ইসরায়েল দাবি করেছে, হামাস জিম্মিদের মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, তারা আরও বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গাজায় হামলার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পরামর্শ করেই ইসরায়েল এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এই হামলা ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ত্রাণ সহায়তা প্রবেশে কোনো বাধা না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।

১৯ জানুয়ারি গাজায় ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার মেয়াদ শেষ হয় ২ মার্চ। তবে পবিত্র রমজান এবং ইহুদিদের পাসওভার উৎসবের কথা মাথায় রেখে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু সোমবার রাতে এই চুক্তি লঙ্ঘন করল ইসরায়েল।

গাজার বাসিন্দা আহমেদ আবু রিজক বলেন, ‘রাত ২টার দিকে ঘুম ভেঙে দেখি, চারপাশে বোমার শব্দ। শিশুরা আতঙ্কে কেঁপে উঠছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি, মানুষজন তাঁদের ছিন্নভিন্ন সন্তানের দেহ নিয়ে ছুটছে হাসপাতালে।’

একইভাবে, মোমেন কোরেইকেহ নামে এক ব্যক্তি জানান, ইসরায়েলি হামলায় তিনি তাঁর পরিবারের ২৬ জন সদস্যকে হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে নবজাতক শিশুও ছিল।

ইসরায়েলের এই হামলার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইরান, কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডান। কাতার বলেছে, এই হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। মিসর একে যুদ্ধবিরতির সরাসরি লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইসরায়েলের এই আগ্রাসন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। বেইজিং দুই পক্ষকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে, আর রাশিয়া পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে বলে জানিয়েছে।

মিসর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ আলোচনা শেষে ১৯ জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। হামাস ইতিমধ্যে ৩৮ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে, বিনিময়ে প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দী মুক্তি পেয়েছে।

তবে ইসরায়েল গাজার সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে রাজি না হওয়ায় আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ে। আর সোমবার রাতের হামলার পর সেই আলোচনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলের হামলার পর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইসরায়েলের দিকে, যা প্রতিহত করার দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

এই হামলার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজায় হামলা বন্ধ করতে হবে এবং সেখানে মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দিতে হবে।

ফিলিস্তিনের জনগণ একবার যুদ্ধবিরতির মধ্যে একটু শান্তি পেয়েছিল, কিন্তু ইসরায়েলের নতুন হামলা সেই শান্তিকে সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি গাজার দিকে—এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত কি থামবে, নাকি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ