আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মাদক কার্টেল দমনে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার ক্যারিবীয় সাগরে মোতায়েন করা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’ (USS Gerald R. Ford)। শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) এক ঘোষণায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমধ্যসাগরে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা রণতরীটি এবার ক্যারিবীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে একাধিক সহগামী যুদ্ধজাহাজ, স্টেলথ ফাইটার জেট ও নজরদারি বিমান। এই বিশাল বহর যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’-এর অংশ হিসেবে কাজ করবে, যা একযোগে সমুদ্র ও আকাশ থেকে আঘাত হানতে সক্ষম।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেন,
“এই বাড়তি নৌ উপস্থিতি আমাদের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে। অবৈধ কার্যকলাপ, মাদক পাচার এবং এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখন আরও প্রস্তুত। এসব অপতৎপরতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
অন্যদিকে, মার্কিন এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন,
“তারা (মার্কিন প্রশাসন) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আর কোনো যুদ্ধে জড়াবে না। অথচ এখন তারাই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করছে।”
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন মাদক কার্টেলবিরোধী অভিযান জোরদার করছে। এরই অংশ হিসেবে সন্দেহভাজন একাধিক মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন,
“আমাদের সামরিক অভিযানের পরবর্তী ধাপ হবে স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা। স্থলই হবে পরবর্তী লক্ষ্য।”
যদিও তিনি নির্দিষ্ট করে কোনো দেশ বা স্থানের নাম উল্লেখ করেননি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন—এই ঘোষণা মূলত ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্য করেই দেওয়া।
রক্ষণশীল বিশ্লেষকদের ভাষায়, ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড-এ থাকা ডজনখানেক এফ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ ও আঘাত হানার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াবে। প্রয়োজনে এগুলো ভেনেজুয়েলার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সরাসরি হামলা চালাতে পারবে। এতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ও ড্রোন ইউনিটগুলোর জন্য স্থলভিত্তিক অভিযান চালানো আরও সহজ হবে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে প্রশাসনের পরিকল্পনা সম্পর্কে কংগ্রেসকে অবহিত করতে বলেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো দেশ বা লক্ষ্যবস্তুর নাম প্রকাশ করেনি, তবে সূত্র বলছে—এটি ক্যারিবীয় অঞ্চলে এক নতুন সামরিক উপস্থিতির সূচনা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ শুধু মাদকবিরোধী অভিযান নয়—এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক বার্তাও। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ঠেকাতেই ওয়াশিংটনের এই নতুন উদ্যোগ।
এ অবস্থায় ক্যারিবীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মাদুরো প্রশাসন বলছে, তারা শান্তি চায়, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। একদিকে মাদকবিরোধী যুদ্ধ, অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে ক্যারিবীয় আকাশে আবারও ভেসে উঠছে উত্তপ্ত এক ছায়াযুদ্ধের আশঙ্কা।








