রবিবার, ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৩১ বছর পর স্বপ্নপূরণ: দম্পতির একসঙ্গে দাখিল পাস

বিশেষ প্রতিবেদক:

‘বয়স শুধুই একটি সংখ্যা’—এ কথার সত্যতা আবারও প্রমাণ করলেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের মুহাম্মদ কাইসার হামিদ (৫১) ও মোছাম্মৎ রোকেয়া আক্তার (৪৪)। সংসার জীবনের ৩১ বছর পেরিয়ে এসে এবার একসঙ্গে দাখিল (এসএসসি সমমান) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনেই গড়েছেন অনন্য নজির। একই ফলাফল—জিপিএ ৪.১১—পেয়ে তারা শুধু নিজেদের স্বপ্নপূরণই করেননি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার মুখ।

বৃহস্পতিবার মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর তাদের ঘরে বইছে খুশির জোয়ার। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী—সবাই যেন আনন্দে আত্মহারা। কেউ তাদের বাড়িতে ছুটে যাচ্ছেন শুভেচ্ছা জানাতে, কেউ সামাজিক মাধ্যমে জানাচ্ছেন অভিনন্দন। কেউ কেউ আবার মিষ্টিমুখ করিয়ে ভাগ বসাচ্ছেন সেই আনন্দে।

নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বিন্নাবাইদ দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা থেকে তারা শিক্ষা জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ কেন্দ্র থেকে এবার তারা দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সফলতা অর্জন করেন।

এক সময় পড়াশোনার পাঠ মাঝপথে থেমে গিয়েছিল এই দম্পতির। কিন্তু সেই অপূর্ণতার বোঝা তারা দীর্ঘদিন বয়ে বেড়িয়েছেন। অবশেষে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মানসিক দৃঢ়তায় তারা ঘুচিয়েছেন সেই দুঃখ, শুরু করেছেন জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং এই পথচলা এখন সমাজের জন্য এক নতুন বার্তা—শিক্ষা কখনো থেমে থাকে না, শেখার কোনো বয়স নেই।

মুহাম্মদ কাইসার হামিদের বাড়ি কুলিয়ারচরের পশ্চিম গোবরিয়া গ্রামে। রোকেয়া আক্তারের বাড়ি কটিয়াদী উপজেলার দক্ষিণ লোহাজুরী গ্রামে। ৩১ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। সংসার ও সন্তানদের নিয়ে তাদের জীবনের একটা দীর্ঘ অধ্যায় পার হলেও, পড়াশোনার অপূর্ণতা তাদের দুজনকেই নাড়া দিত।

পরিবারের অন্য সদস্যরা উচ্চশিক্ষিত হলেও তারা দুজন মাধ্যমিক পাস না করায় মনে লেগে ছিল একরাশ আক্ষেপ। এবার সেই আক্ষেপের জবাব দিলেন তারা।

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ শুধু একজন শিক্ষার্থী নন, তিনি কিশোরগঞ্জের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনেরও পরিচিত মুখ। কবিতা লেখেন, সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত। ইতোমধ্যে তার শতাধিক কবিতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “সমাজ থেকে অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু শিক্ষা ছিল না বলেই যেন কোথাও একটা শূন্যতা থেকে যাচ্ছিল। এবার সেই শূন্যতাকে ঘুচিয়েছি আমরা দুজন মিলে।”

রোকেয়া আক্তার বলেন, “অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল, তাই এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। সেই কষ্ট দীর্ঘ তিন যুগ ধরে বয়ে বেড়াতে হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই এই কষ্ট থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিলাম। অবশেষে সফল হয়েছি।”

এখন কিশোরগঞ্জে এই দম্পতি শুধু সফল পরীক্ষার্থী নন, বরং অনেকের কাছে হয়ে উঠেছেন সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তাদের এই অর্জন দেখিয়ে দিয়েছে, যাত্রা থেমে গেলেও শুরু করা যায় আবার—নতুন করে, আরও দৃঢ়ভাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ