,

আইসিএক্স বাতিল হলে সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি হবে

টেলিকম খাতে প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) বাদ দেওয়ার উদ্যোগে প্রতিবাদ জানিয়েছে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে, বিপরীতে আয় হবে মাত্র ১৬ কোটি টাকা। একইসঙ্গে ৭০০ প্রকৌশলীর কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে, বাড়বে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম, এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার আইসিএক্স ফোরাম ও টেলিকম রিপোর্টারদের আয়োজিত এক সংলাপ ও কর্মশালায় এসব আশঙ্কার কথা জানানো হয়। টেলিযোগাযোগ নীতিমালা সংশোধনের খসড়া নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা। আয়োজনটি করে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্কস বাংলাদেশ (টিআরএনবি)। অ্যাসোসিয়েশন অব আইসিএক্স অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এআইওবি)-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আইসিএক্স হলো টেলিকম খাতের তৃতীয় চোখ। এ খাতের ডিজিটাল নজরদারি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।” তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের নামে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খুরশীদ আলম (অব.), এআইওবির কোষাধ্যক্ষ, বলেন, “আইসিএক্সের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ঠেকানো, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার যে উদ্দেশ্যে নীতিমালা করা হয়েছিল, তা আজ ভূলুণ্ঠিত হতে চলেছে। মোবাইল অপারেটরদের জন্য অতিরিক্ত সুযোগ রেখে লেয়ার কমানোর অজুহাতে আইসিএক্স বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।” অগ্নি সিস্টেমসের হেড অব অপারেশন আহমেদুর রহমান রুমেল জানান, প্রতিদিন দেশে শত কোটি এসএমএস আদান-প্রদান হয় আইসিএক্সের মাধ্যমে। এই বিনিময়ে এখন ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার রাজস্ব আয় না হলেও, আইসিএক্স চালু থাকলে বছরে সরকারের আয় হতে পারে ৮৪ কোটি টাকা।
ভয়েসটেল, বাংলা আইসিএক্স, বাংলাটেলিকম এবং ইমাম নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিরা জানান, দেশে বর্তমানে ৫০টির বেশি ভয়েস সার্ভিস প্রদানকারী অপারেটর আছে। এসব অপারেটর পৃথকভাবে সংযোগ স্থাপন করলে খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা কেবল আইসিএক্স ব্যবস্থা এড়ানোর ফলে হবে। আইসিএক্স বাতিলে অবৈধ ভিওআইপি এবং কর ফাঁকির আশঙ্কাও বাড়বে।
আইসিএক্সের প্রধান কাজ হলো আন্তর্জাতিক গেটওয়ের (আইজিডব্লিউ) মাধ্যমে আসা কলগুলোর গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া। মোবাইল ও ল্যান্ডলাইন অপারেটরদের মধ্যে তথ্য ও ভয়েস ট্রাফিকের বিনিময় এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত থাকে, ফলে সরকার নজরদারি রাখতে পারে এবং গ্রে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। এর ফলে রাজস্ব ফাঁকি রোধ হয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। বর্তমান খসড়া নীতিমালায় আইসিএক্স বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এই খসড়া তৈরি করেছে টেলিকম খাতের ব্যবসা ও লাইসেন্স পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে। এতে মোবাইল অপারেটরদের গেটওয়ে পর্যায়ে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে আইসিএক্সের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে প্রতি মোবাইল কলের ক্ষেত্রে ২ টাকা ৪০ পয়সা চার্জ নেওয়া হয়। এর মধ্যে আইসিএক্স পায় ৪ পয়সা। এই চার পয়সার মধ্যে ২ পয়সা বিটিআরসিকে দিতে হয়, যার মধ্যে এক পয়সা চলে যায় ট্যাক্স, ভ্যাট এবং লাইসেন্স ফি বাবদ। আইসিএক্স কোম্পানির হাতে থাকে কেবল ১ পয়সা। নতুন নীতিমালায় এই ১ পয়সাও কেটে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। আয়োজক ও বক্তারা বলেন, টেলিকম খাতে আইসিএক্সের ভূমিকা শুধু একটি প্রযুক্তিগত স্তর নয়, এটি একটি সুরক্ষা ব্যবস্থাও বটে। এই ব্যবস্থা তুলে দিলে পুরো টেলিকম খাত একটি অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যাবে। সরকারের রাজস্ব কমবে, বৈধতা হারাবে অনেক সেবা, এবং বিদেশি কোম্পানির আধিপত্য বাড়বে। তারা সরকারের কাছে দাবি জানান, খসড়া নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে দেশের স্বার্থে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে (যেমন আইটিইউ) ভেটিং করানো হোক এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে বিবেচনায় রাখা হোক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই বিভাগের আরও সংবাদ >

সর্বশেষঃ